ঢাকার গাড়ির বাজারে এখন সবচেয়ে আলোচিত নাম মো. হারুন অর রশিদ ওরফে রুবেল। অভিযোগ উঠেছে, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া বা আত্মগোপনে থাকা প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের কোটি কোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়ির মালিকানা জালিয়াতির মাধ্যমে পরিবর্তন করে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন এই চিহ্নিত বিআরটিএ দালাল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিআরটিএ’র একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে মাত্র কয়েক মাসে প্রায় ৫০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন রুবেল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গ্রেফতার ও আইনি জটিলতা এড়াতে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের বহু নেতা তাদের ফেলে যাওয়া ল্যান্ড ক্রুজার, প্রাডো, হ্যারিয়ার, অডি ও অন্যান্য বিলাসবহুল গাড়ি দ্রুত বিক্রি করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। আর এই সংকটময় পরিস্থিতিকেই ‘সুবর্ণ সুযোগ’ হিসেবে কাজে লাগান রুবেল।
অভিযোগ রয়েছে, বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে এসব গাড়ি বিক্রির ব্যবস্থা করে দেওয়ার দায়িত্ব নেন তিনি। পরে পুরো মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যান। অথচ প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, গাড়ির মালিকানা পরিবর্তনের জন্য ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের বিআরটিএ কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে বায়োমেট্রিক তথ্য ও ছবি প্রদান বাধ্যতামূলক। কিন্তু পলাতক বিক্রেতাদের উপস্থিতি ছাড়াই কীভাবে একের পর এক ফাইল অনুমোদন পেল?
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগ অনুযায়ী, জাল স্বাক্ষর, ভুয়া হলফনামা, ব্যাকডেট এন্ট্রি এবং অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতায় বিক্রেতার অনুপস্থিতিতেই গাড়ির মালিকানা পরিবর্তনের ফাইল পাস করানো হয়েছে। প্রতিটি গাড়ির জন্য ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মিরপুর বিআরটিএ’র পশ্চিম পাশে অবস্থিত ‘শাহরাস্তি বিজনেস সেন্টার’-এর একটি অফিস থেকেই পুরো সিন্ডিকেট পরিচালিত হতো। বাইরে থেকে এটি সাধারণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অফিস মনে হলেও, অভিযোগ রয়েছে—এটিই ছিল অবৈধ গাড়ি বেচাকেনা, কাগজপত্র জালিয়াতি এবং মালিকানা পরিবর্তন বাণিজ্যের গোপন নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র।
আরও জানা গেছে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দালালির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে নিজের ও স্ত্রীর নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তুলেছেন রুবেল। বিভিন্ন সিএনজি ও গাড়ির নথিতে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম দাম দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
কাগজে-কলমে প্রতিটি সিএনজির মূল্য ৭ থেকে ১০ লাখ টাকা দেখানো হলেও বাস্তবে বাজারমূল্য ছিল ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা। অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর সেনপাড়া পর্বতায় তার একটি ফ্ল্যাট, শাহআলী প্লাজায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং একাধিক সিএনজি ও মাইক্রোবাস রয়েছে। তার স্ত্রী তানিয়ার নামেও রয়েছে প্রায় আটটি সিএনজি অটোরিকশা, যেগুলো স্বামীর অবৈধ আয়ের অর্থে কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে বিআরটিএ’র সাধারণ গ্রাহক ও ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মাঝে-মধ্যে লোক দেখানো অভিযান পরিচালিত হলেও মূল দালালচক্র সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাদের দাবি, দ্রুত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত তদন্ত এবং কঠোর হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সিন্ডিকেটের লাগাম টানা সম্ভব নয়। অন্যথায় বিআরটিএ’তে দালালচক্র, জালিয়াতি ও রাজস্ব ফাঁকির কর্মকাণ্ড আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
এ বিষয়ে হারুন অর রশিদ ওরফে রুবেলের সঙ্গে সেলফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে বিআরটিএ’র দালালির অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরে বলেন, তিনি বাইরে দোকান থেকে কাজ করেন। নিজের ও স্ত্রীর নামে বিপুল সম্পদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। একপর্যায়ে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
প্রশ্ন এখন একটাই—পলাতকদের বিলাসবহুল গাড়ির মালিকানা বদলের এই কোটি টাকার কারবার কি শুধুই একজন দালালের পক্ষে সম্ভব, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও বড় কোনো প্রভাবশালী সিন্ডিকেট?
এসব অনিয়মের বিষয়ে বিআরটিএ কোন অসাধু কর্মকর্তা জড়িত থাকার বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী সংখ্যায়। চলবে………….
