মিরপুর-১০ এর আদর্শ হাইস্কুল মাঠে নির্বাচনী জনসমাবেশ ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে নতুন পোশাকে ফ্যাসিবাদের উত্থান হলে তা ৫ আগস্টের মতো পরিণতি বয়ে আনবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামী আমির ও ঢাকা-১৫ আসনের প্রার্থী ডা. শফিকুর রহমান। বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুর-১০ এর আদর্শ হাইস্কুল মাঠে নির্বাচনী জনসমাবেশে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এ দেশে আমরা ফ্যাসিবাদের ছায়াও দেখতে চাই না। ফ্যাসিবাদ যদি আজ নতুন কোনো পোশাক পরে আসে, তবে ৫ আগস্টের মতোই পরিণতি তাদের ভোগ করতে হবে।
তিনি দাবি করেন, জনগণের ত্যাগ ও কোরবানির বিনিময়ে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিএনপির ঘোষিত ফ্যামিলি কার্ড প্রসঙ্গে ইঙ্গিত করে জামায়াত আমির বলেন, কোনো কার্ডের ওয়াদা করবে না জামায়াতে ইসলামী। দুই হাজার টাকায় কিছুই হয় না। আমরা প্রত্যেকের জন্য ইনসাফের বাংলাদেশ গড়তে চাই। তিনি আরও যোগ করেন, যারা নিজের দলের লোকজনকে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি থেকে বিরত রাখতে পারবে, আগামীর বাংলাদেশ তারাই গড়বে। দোকান, গাড়ি, ফুটপাত—সব জায়গায় চাঁদাবাজি হয়। এটা বন্ধ করা হবে।
নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার করে তিনি বলেন, আমরা সব সহ্য করব, কিন্তু মায়েদের ইজ্জতের বিষয়ে কোনো অপমান বরদাশত করব না। কর্মক্ষেত্রে নারীদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। নারী-পুরুষ সবাই মিলে আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তুলবো। সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হলে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী, খুন, ধর্ষণ, ব্যাংক ডাকাতি চলতে পারবে না। সমাজের কোনো স্তরে বৈষম্য থাকবে না। ইনসাফ ভিত্তিক বৈষমীহীন বাংলাদেশ গড়তে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থীদের ভোট দিয়ে জনগণের বিজয় নিশ্চিত করতে হবে।
আগামী নির্বাচনকে তিনি ‘গণভোট’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এ বিজয় কোনো পরিবারের হবে না। ইনসাফের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতবে।
তিনি দাবি করেন, দেশে একটি বেসরকারি কর বা ‘ট্যাক্স’ ব্যবস্থা চলছে, যা চাঁদাবাজি ছাড়া কিছু নয়। রাস্তার পাশে ভিক্ষা করা মানুষের কাছ থেকেও ট্যাক্স নেওয়া হয়। এই চাঁদাবাজি বন্ধ করা হবে।
অতীত ফ্যাসিবাদী সরকারের দিকে ইঙ্গিত করে জামায়াত আমির বলেন, যারা ফ্যাসিবাদের জাঁতাকলে জনগণকে পিষ্ট করেছে, আজ তাদের আর দেখা যায় না—এটাও বড় শান্তি। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমি আজ এখানে জামায়াতের আমির হিসেবে দাঁড়াইনি। আমি দাঁড়িয়েছি রিকশা-ভ্যান-ঠেলা চালক, গার্মেন্টস কর্মী, দোকান-কর্মচারী ও সাধারণ শ্রমিক-জনতার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। যারা বৈষম্যের শিকার আমি তাদের হয়ে জনগণের সামনে দাঁড়িয়েছি। আমি চব্বিশের বিপ্লবীদের হয়ে দাঁড়িয়েছি। যেই বিপ্লবীদের জীবন আজ হুমকির মুখে। এক হাদিকে হত্যা করে ১৮ কোটি জনগণের হৃদয়ে হাদির জন্ম হয়েছে। কোটি কোটি মানুষ হাদি হতে প্রস্তুত।
হাদির রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ দেশে আর কোনো আধিপত্যবাদী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। আধিপত্যবাদ-ফ্যাসিবাদ মুক্ত নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে। আমরা বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের আর কোনো ছায়াও দেখতে চাই না। ফ্যাসিবাদ নতুন জামা পরে কেউ আসলে ৫ আগস্টের মতোই তাদেরও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে। তিনি বলেন, যারা মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল তারা ভোট ডাকাত। আমরা আর কোনো ভোট ডাকাত দেখতে চাই না। বিগত তিনটি নির্বাচন নয় এমনও মানুষ আছে যারা জীবনেও ভোট দিতে পারেনি। কারণ তাদের ভোট ডাকাতি করা হয়েছিল। তিনি তাঁর বক্তব্যে ঢাকা-১৫ আসনের সংকটগুলো তুলে ধরে সেগুলোর সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেন। সমাবেশস্থলে দুপুর থেকেই খণ্ড খণ্ড মিছিল এসে জড়ো হয়। ‘চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’ স্লোগানে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্য দিয়ে জামায়াত আমির চার দিনের নির্বাচনী সূচনা করেন।
১৭ বছর পরে লন্ডন থেকে একজন মুফতি এসেছেন: সাইফুল আলম খান মিলন
জামায়াত ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, ১৭ বছর পরে লন্ডন থেকে একজন মুফতি এসেছেন আমাদের দেশে। তিনি আমাদের মুসলমানদের কুফরি আখ্যা দিচ্ছেন। তিনি বলেন, আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ চাই। যে রাজনীতিবিদরা ভারতের আশীর্বাদ নিয়ে দেশ শাসন করতে চায়, এমন শাসন আমরা চাই না, আমরা নতুন বাংলাদেশ চাই।
জাগপা সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান বলেন, আমরা শান্তি চাই৷ কিন্তু আমাদের শান্তির পথ কেউ রুখতে চাইলে কঠিন ভাষায় জবাব দেব। আমরা শহীদ হতে প্রস্তুত আছি। আমাদের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। নতুন বাংলাদেশে কোনো জুলুম চলবে না। জবাব হবে ১২ ফেব্রুয়ারি। আমি একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু, মহান আল্লাহ আমাকে একটির পরিবর্তে ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ করে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, আমরা আগামীর বাংলাদেশ স্বৈরাচারমুক্ত চাই, ভারতীয় প্রভাবমুক্ত বাংলাদেশ চাই। তাই, নির্বাচনে ভোট দেওয়ার আগে বিবেচনা করুন, কারা ভারতের পক্ষে আর কারা দেশের স্বার্থের পক্ষ। জুলাই আন্দোলনকে বিজয়ী করতে অবশ্যই গণভোটকে হ্যাঁ বলুন। এসময় নাহিদ ইসলামের হাতে পাল্লাকলি তুলে দেওয়া হয়।
১০ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য জোটের ‘সমন্বিত প্রতীক’ হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের হাতে দাঁড়িপাল্লা ও শাপলা কলির সমন্বয় পাল্লা-কলি তুলে দেন ডা. শফিকুর রহমান। জামায়াত আমির বলেন, উনার (নাহিদ ইসলাম) হাতে একটা সমন্বিত প্রতীক তুলে দিচ্ছি। আজকে বাকিদের হাতে দেবো দাঁড়িপাল্লা, আর উনার হাতে দেবো ‘পাল্লা-কলি’।
এ সময় দাঁড়িপাল্লার উপরের অংশের দিকে ইঙ্গিত করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এখানে পাল্লা আছে। আর উপরের দিকে দেখেন, কলি আছে। এটাকেই আপনারা শাপলা কলি ধরে নেবেন, ইনশাআল্লাহ। ঢাকা-১১ আসনের যারা ভোটার তাদের জন্য ইনসাফের প্রতীকের সঙ্গে শাপলা কলি আমরা জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের হাতে তুলে দিচ্ছি।
এ সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন যথাক্রমে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা তোফাজ্জল হোসেন মিয়াজী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মজলিসে শূরার সদস্য মাওলানা তাহিদুজ্জামান, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ সাবেক এমপি মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, ঢাকা-১৪ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ব্যারিস্টার আহমেদ বিন কাশেম আরমান, কর্ণেল (অব) হাসিনুর রহমান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ঢাকা মহানগরী উত্তরের জয়েন্ট সেক্রেটারি মুফতি আহসান উল্লাহ কাসেমী, ঢাকা-১৭ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ডা. এস এম খালিদুজ্জামান, ঢাকা-১৬ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী কর্নেল আব্দুল বাতেন।
ঢাকা-১৫ আসন কমিটির পরিচালক আব্দুর রহমান মুসার সভাপতিত্বে ও ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলামের সঞ্চালনায় জনসভায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেন শহীদ আব্দুল হান্নান খানের ছেলে ডা. সাইফ খান। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি লস্কর মো. তসলিম, কাফরুল দক্ষিণ থানা আমীর আনোয়ারুল করিম, কাফরুল পশ্চিম থানা আমীর আব্দুল মতিন খান, কাফরুল উত্তর থানা আমীর রেজাউল করিম মাহমুদ, জুলাইযোদ্ধা কাজী সাইফুল ইসলাম প্রমুখ।
