শুক্রবার, ১১ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিআইডব্লিউটিএতে ৪৪ হাজার লিটার তেল চুরি, মূলহোতা মাস্টার নজরুল

স্টাফ রিপোর্টার
সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬ ১১:৪০ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

জাহাজে সরবরাহ দেখিয়ে তেল উধাও, গভীর রাতে ট্যাঙ্কারে সরকারি ডিজেল পাচারের অভিযোগ-কর্মচারীদের মুখ বন্ধে ১১ লাখ টাকা দেওয়ার চেষ্টা। ফাইল ফটো

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে জাহাজের জ্বালানি তেল চুরি, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি এবং ঠিকাদারি অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেটের যোগসাজশে সংঘটিত এসব অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন চাঁদপুর নদী বন্দরের টাগবোট ‘দুর্দান্ত’ জাহাজের মাস্টার নজরুল ইসলাম এবং নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের চাঁদপুর কার্যালয়ের যুগ্ম-পরিচালক মোঃ সবুর খান—এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে গত ১৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান সরকারি ডিপো থেকে ডিজেল ও লুব-অয়েল ক্রয়ের নির্দেশ দেন। ওই আদেশের পর চাঁদপুর ডিপো থেকে গত ১৮ মার্চ ২০২৬ তারিখ থেকে ধাপে ধাপে চার দফায় সর্বমোট ৪৪ হাজার লিটার ডিজেল ও লুব-অয়েল সংগ্রহ করা হয়।

কাগজপত্রে এসব জ্বালানি বিভিন্ন নৌযানে সরবরাহ দেখানো হলেও বাস্তবে সেগুলোর বড় অংশ বা সম্পূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ করা হয়নি—এমন অভিযোগের তথ্য অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

কাগজে দেখানো জ্বালানি সরবরাহের তালিকায় রয়েছে—

উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম: ৮,০০০ লিটার ডিজেল

ওয়ার্কবোট কপোত ও আড়িয়াল খাঁ: যথাক্রমে ৩,০০০ ও ৫,০০০ লিটার ডিজেল

টাগবোট দুর্দান্ত: ২৬,০০০ লিটার ডিজেল

এসএমবি-৩ মার্কিং বোট: ২,০০০ লিটার ডিজেল

অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই সময়ে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘রুস্তম’ কিংবা টাগবোট ‘দুর্দান্ত’ কোনো উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়নি। এমনকি এসএমবি-৩ মার্কিং বোটটি অলস বসিয়ে রেখে ভাড়াকৃত সাধারণ নৌকা দিয়ে মার্কিংয়ের কাজ পরিচালনা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এর পেছনে গত তিন মাসে অতিরিক্ত ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ভাড়া বিল দেখানোর তথ্যও পাওয়া গেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতি লিটার ৯৫ টাকা হিসাবে ৪৪ হাজার লিটার ডিজেলের বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এই বিপুল পরিমাণ সরকারি জ্বালানি তেল চোরচক্রের মাধ্যমে খোলা বাজারে বিক্রি করে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গভীর রাতে ট্যাঙ্কারে সরকারি ডিজেল!

অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশটি উঠে এসেছে গত ৩০ মে ২০২৬ তারিখের একটি ঘটনার সূত্র ধরে। গোপন সিসিটিভি ফুটেজ ও অনুসন্ধানী তথ্যে দেখা যায়, গভীর রাতে টাগবোট ‘দুর্দান্ত’-এর মাস্টার নজরুল ইসলাম নিজে পাহারা দিয়ে পাম্প মেশিনের মাধ্যমে চাঁদপুরের তেল ব্যবসায়ী সুমনের ট্যাঙ্কারে সরকারি ডিজেল সরবরাহ করছেন—এমন দাবি করা হয়েছে।

সরকারি বিধি অনুযায়ী, জাহাজের ইঞ্জিন রুম ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ড্রাইভারের ওপর ন্যস্ত থাকার কথা। অভিযোগ রয়েছে, সেই বিধি উপেক্ষা করে মাস্টার নজরুল ইসলাম নিজেই তেল পাচার কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন।

ঘটনাটি জাহাজের কয়েকজন কর্মচারীর নজরে এলে বিষয়টি নিয়ে তাদের মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ সময় তাদের ১১ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। পরবর্তীতে ঘটনা প্রকাশ না করতে স্থানীয় ক্যাডারদের মাধ্যমে কর্মচারীদের চাকরিচ্যুত ও অন্যত্র বদলির হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

‘বিষয়টি জানি’, মন্তব্যে নারাজ সবুর খান

সরকারি সম্পত্তি ও বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল চুরির ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাঁদপুর নদী বন্দরের যুগ্ম-পরিচালক মোঃ সবুর খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন বলে স্বীকার করেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত টাগবোট ‘দুর্দান্ত’-এর মাস্টার নজরুল ইসলাম তেল চুরির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে ভিডিও প্রকাশের বিষয়টি উল্লেখ করে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ জানান তিনি।

দুদকের তদন্ত দাবি

বিআইডব্লিউটিএ-এর মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রতিষ্ঠানে সরকারি জ্বালানি চুরি, ভুয়া সরবরাহ দেখানো এবং বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগকে অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র, জ্বালানি উত্তোলন রেজিস্টার, সরবরাহ রেকর্ড, জাহাজের মুভমেন্ট লগ ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতের ঘটনা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত ফৌজদারি ও দুর্নীতি দমন আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অপরাধের ধরন ও সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে গুরুতর শাস্তির বিধানও রয়েছে।

এ অবস্থায় বিআইডব্লিউটিএতে সরকারি জ্বালানি তেল চুরির অভিযোগের বিষয়ে দ্রুত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সচেতন নাগরিকরা।

তবে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, সিসিটিভি ফুটেজ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য যাচাইসহ স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।