রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ভিসিকে ঘেরাও করে পদত্যাগপত্রে সই নেওয়ার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে মানববন্ধন। ছবি: সংগৃহীত
রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হক ও তাঁর একান্ত সচিব (সেকশন অফিসার) নাজমুল হোসাইনকে ‘মব’ করে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানোর ঘটনায় মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় রাজপাড়া থানা বিএনপির সহসভাপতি আব্দুস সালামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে নগরীর প্যারামেডিক্যাল এলাকার নিজ বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মঙ্গলবার রাতে নগরীর রাজপাড়া থানায় অজ্ঞাতসহ ৫০ থেকে ৬০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসার ও ভিসির একান্ত সচিব নাজমুল হোসাইন।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র উপ-পুলিশ কমিশনার গাজীউর রহমান জানান, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা, সরকারি কাজে বাধা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা, সরকারি মালামাল লুট এবং অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগে ভিসির পিএস নাজমুল হোসাইন বাদী হয়ে রাজপাড়া থানায় মামলা করেছেন। মামলা রেকর্ডভুক্ত হওয়ার পর গভীর রাতে আব্দুস সালামকে গ্রেপ্তার করা হয়। ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এদিকে উপাচার্যকে অপমান, অপদস্ত, লাঞ্ছিত ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে অবৈধভাবে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানোর প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
ঘটনার পর থেকে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্যাম্পাসে এলেও স্বাভাবিকভাবে কোনো কাজ করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার ডা. মো. মোফাখখারুল ইসলাম।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজের পরিবেশ তৈরি হয়নি। পুরো ক্যাম্পাসে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানের সঙ্গে এমন ঘটনার পর থেকে সবাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
যেভাবে ভিসির পদত্যাগে সই নেওয়া হয়
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ‘রাজশাহীর আপামর ছাত্র-জনতা’ লেখা ব্যানার নিয়ে বিএনপি ও কৃষক দলের ৪০ থেকে ৫০ জন নেতাকর্মী মিছিল করে উপাচার্যের কার্যালয়ে যান। এতে নেতৃত্ব দেন মহানগর কৃষক দলের আহ্বায়ক শামীম। তাঁর সঙ্গে ছিলেন রাজপাড়া থানা বিএনপির সহসভাপতি আব্দুস সালাম ও সাংগঠনিক সম্পাদক হারুনুর রশীদসহ অন্যরা।
দরজায় ধাক্কা দিয়ে তারা উপাচার্যের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। এরপর উপাচার্যের টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ান আব্দুস সালাম ও হারুনুর রশীদ। এ সময় সাগর নামে এক বিএনপিকর্মী আগে থেকে লেখা একটি পদত্যাগপত্র এনে হারুনুর রশীদের হাতে দেন। পরে হারুনুর রশীদ ও আব্দুস সালাম উপাচার্যকে ওই পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ সময় বিক্ষোভকারীরা ‘জ্বালো জ্বালো, আগুন জ্বালো’, ‘জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও, আওয়ামী লীগের আস্তানা’ এবং ‘আওয়ামী লীগের ভিসি হুঁশিয়ার, সাবধান’—এ ধরনের স্লোগান দেন।
পরে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ঠিকাদার ও রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকা কিছু লোক এর আগেও আমার পদত্যাগ দাবিতে মানববন্ধন করেছিল। বিভিন্ন সময় তারা আমার কাছে ঠিকাদারি কাজ চাইত। তাদের দাবি, আমি যেন জোর করে তাদের কাজ পাইয়ে দিই। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় তারা হঠাৎ আমার অফিসে জোর করে ঢুকে যায়। তারা অভিযোগ করে, তাদের কাজ না দিয়ে ঢাকার ঠিকাদারকে দিয়েছি। এ সময় তারা আমাকে আওয়ামী লীগের দোসর বলে লাঞ্ছিত করে। তারা মব সৃষ্টি করে আমার মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেয়। প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে তাদের লেখা একটি পদত্যাগপত্রে জোর করে স্বাক্ষর নেয়।
উপাচার্য আরও বলেন, তারা পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নিয়ে আমাকে বের করে দিয়ে অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেয়। জোর করে এভাবে কখনও পদত্যাগ করানো যায় না। কিন্তু অফিসে যাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। তারা আমার একান্ত সচিব নাজমুল হোসাইনকে অবরুদ্ধ করে মানসিক ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে। অফিসের সিসি ক্যামেরার হার্ডডিস্ক, কম্পিউটারের সিপিইউ নিয়ে গেছে। এটি কোনো নিয়মতান্ত্রিক পদত্যাগ নয়, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।
‘অস্ত্র ঠেকিয়ে স্বাক্ষর করানো হয়েছে’
উপাচার্যের একান্ত সচিব ও সেকশন অফিসার নাজমুল হোসাইন বলেন, তাদের হাতে অস্ত্র ছিল। অস্ত্র ঠেকিয়ে তারা আমাকে স্বাক্ষর করায়। এটা কোনো ইস্তফা নয়, অস্ত্রের মুখে এটা করেছে।
বিএনপি নেতার দাবি, দলীয় সিদ্ধান্ত নয়
এ বিষয়ে জানতে কৃষক দলের রাজশাহী মহানগর শাখার আহ্বায়ক শরফুজ্জামান শামীমকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
তবে বিএনপি নেতা আব্দুস সালাম বলেন, তাঁতী দলের মহানগর সভাপতি কাজল, কৃষক দলের আহ্বায়ক শামীম, জিয়া মঞ্চের মহানগর সভাপতি কামাল, হারুন এবং আমার নেতৃত্বে ভিসিকে পদত্যাগ করানো হয়েছে। এটার বিষয়ে আমাদের নেতা নজরুল হুদা (মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি) সব জানেন। কিছু জানার থাকলে নজরুল হুদার কাছে জানেন।
এ বিষয়ে মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি নজরুল হুদা বলেন, এটা দলীয় সিদ্ধান্ত নয়, ছাত্র-জনতার ব্যানারে স্থানীয় বিএনপি ও এলাকাবাসী করেছে। এটা ভিসির কারণেই হয়েছে। ভিসি নিয়োগ বাণিজ্য, দুর্নীতি ও অনিয়ম করেছে। ঠিকাদারি কাজ নিয়েও ঝামেলা করে। এ নিয়ে মানববন্ধন করেছিল। পরে ভিসি পদত্যাগ করেছে শুনলাম।
এটি ‘মব’ কিনা—জানতে চাইলে নজরুল হুদা বলেন, এটাকে মব বলা ঠিক হবে না। এটা প্রতিবাদ। জনগণ ব্যানার দিয়ে করেছে, এটা ৫ আগস্টের মতো ছোটখাটো আন্দোলন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যানার দিয়ে কিছু করলে মব বলা যাবে না। ৫ আগস্টও এভাবেই হয়েছে।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ বিরাজ করছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, দ্রুত স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
