২৩২ জনের বিরুদ্ধে মামলা, ২১৩ জনকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ; ২৫ জনের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের সুপারিশ। ফাইল ছবি
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর নামে সরকার নির্ধারিত ফি’র কয়েকগুণ অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে অভিযুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির মালিকদের ব্যক্তিগত সম্পদ, আয়-ব্যয়ের উৎস এবং বেনামি সম্পদেরও অনুসন্ধান শুরু করেছে সংস্থাটি।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সংঘটিত কথিত অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০০টি রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২৩২ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলার তদন্তের স্বার্থে ২১৩ জনকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
মামলাগুলোতে অভিযোগ করা হয়েছে, ১০০টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মোট ৭ হাজার ৯৮৪ কোটি ১৫ লাখ ৭ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-২ শাখার পরিচালক (বর্তমানে এলপিআররত) এস. এম. এম. আখতার হামিদ ভূঞা স্বাক্ষরিত এক পত্রে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সম্পদের হিসাব চাওয়া হলো অভিযুক্তদের
সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন প্রান্তিক ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরিজম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম মোস্তফা। তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূতভাবে নিজ নামে ও বেনামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(১) ধারা অনুযায়ী চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি তাকে, তার স্ত্রী এবং তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের নামে বা বেনামে অর্জিত সব সম্পদ, দায়-দেনা, আয়ের উৎস ও সম্পদ অর্জনের বিস্তারিত বিবরণ ২১ কার্যদিবসের মধ্যে কমিশনে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
দুদক জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদ বিবরণী জমা না দিলে অথবা মিথ্যা তথ্য প্রদান করলে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ধারা অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
১৬৭ জন সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছেন
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিভিন্ন ধাপে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ১৯১ জনকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং আরও ২২ জনকে নোটিশ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এ পর্যন্ত ১৬৭ জন তাদের সম্পদ বিবরণী কমিশনে জমা দিয়েছেন। এসব বিবরণী যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দুদকের জনসংযোগ বিভাগের উপ-পরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ জারি করা হয়েছে এবং আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে একই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২৫ জনের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদের সম্পদ বিবরণীও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। কারও ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে বাস্তব সম্পদের অসামঞ্জস্য পাওয়া গেলে অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা করা হবে। প্রয়োজন হলে আদালতের মাধ্যমে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক বা অবরুদ্ধের আবেদনও করা হতে পারে।
শ্রমবাজার কেলেঙ্কারিতে সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের নাম
দুদকের করা পৃথক ১২টি মামলায় মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও অর্থ পাচারের অভিযোগে আওয়ামী লীগ সরকারের কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের আসামি করা হয়েছে।
অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল), সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী, সাবেক সংসদ সদস্য ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য বেনজীর আহমদ, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুস সোবহান ভূঁইয়া এবং বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা।
কর্মীপ্রতি কয়েকগুণ বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগ
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা পরস্পরের যোগসাজশে বিএমইটি ও বায়রা-র নিবন্ধনের শর্ত লঙ্ঘন করে সরকার নির্ধারিত কর্মীপ্রতি ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার পরিবর্তে প্রায় ২ লাখ ৪৬ হাজার ৪৯০ টাকা পর্যন্ত আদায় করেছেন। পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বিমান টিকিটসহ বিভিন্ন খাতের নামে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ করে তা আত্মসাতের পাশাপাশি বিভিন্ন উপায়ে বিদেশে পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে।
তবে উল্লেখ করা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সাব-এজেন্ট, বিমান টিকিট ও অন্যান্য মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে আদায়কৃত কিছু অর্থ সরকার নির্ধারিত ফি’র বাইরে ছিল। অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
এছাড়াও রাজধানীর মানিকনগর এলাকায় একাধিক ট্রাভেল এজেন্সি মালিক আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছে,যা এখনো দুদকের নজরে আসেনি। নিজেকে আড়াল করতে মেয়েদের নামে দান পত্র দলিল দিয়েছে।নাম ঠিকানাসহ বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে।
