পেশার প্রতি ভালোবাসা আর সত্যের খোঁজে ছুটে চলা এক সাহসী সাংবাদিক—কিন্তু সেই পথেই ওঁৎ পেতে ছিল সহিংসতার কালো ছায়া। কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন বুড়িচং প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও প্রবীণ সাংবাদিক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হাফিজ।
গত মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল, ২০২৬) বিকেলে ময়নামতি ইউনিয়নের ফরিজপুর এলাকায় ঘটে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা। অভিযোগ রয়েছে, হামলাকারীরা তার ব্যবহৃত দামী ক্যামেরা, মোবাইল ফোন এবং পরিচয়পত্র ছিনিয়ে নিয়ে গেছে।
ভুক্তভোগী ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বিকেল ৪টার দিকে কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের ময়নামতি মিশন স্কুলের পশ্চিম পাশে জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে চলছিল উত্তপ্ত সংবাদ সম্মেলন। সেখানে পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) কাউন্সিলর ও দৈনিক আমার দেশ-এর বুড়িচং প্রতিনিধি সাখাওয়াত হাফিজ।
আবার পরিস্থিতি যখন হঠাৎই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে—দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকলে তিনি সত্য তুলে ধরতে ভিডিও ধারণ শুরু করেন। আর সেই মুহূর্তেই নেমে আসে হামলার ঝড়। অভিযোগ অনুযায়ী, মোঃ সালাহ উদ্দিনের নেতৃত্বে ৪-৫ জন সন্ত্রাসী অতর্কিতভাবে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
এসময় শব্দহীন ক্যামেরার বদলে তখন শোনা যায় আর্তচিৎকার। অকথ্য গালাগালির সঙ্গে শুরু হয় এলোপাতাড়ি মারধর। একপর্যায়ে সালাহ উদ্দিন ধারালো চাইনিজ কুড়াল দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে কোপ দিলে তার ডান হাতের কনুইয়ে গুরুতর রক্তাক্ত জখম হয়—রক্তে ভিজে যায় সত্য বলার হাতটি।
হামলাকারীরা তার কাছ থেকে একটি স্মার্টফোন (মূল্য আনুমানিক ১৮ হাজার টাকা), একটি ভিডিও ক্যামেরা ও সরঞ্জাম (ওয়ারলেস ও বুম মাইক্রোফোনসহ, মূল্য প্রায় ৬০ হাজার টাকা) এবং দৈনিক আমার দেশ ও একুশে বাংলা পত্রিকা-এর আইডি কার্ড ছিনিয়ে নেয়।
সাখাওয়াত হাফিজের চিৎকারে ছুটে আসেন সহকর্মী সাংবাদিক ও স্থানীয়রা। তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। আহত সাংবাদিককে প্রথমে ময়নামতি জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে বুড়িচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এই ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে বুড়িচং থানায় মোঃ সালাহ উদ্দিনকে প্রধান আসামি করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ জনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। ঘটনার সাক্ষী হিসেবে ছিলেন সাংবাদিক আব্দুল মান্নান, আহসানুজ্জামান সোহেলসহ স্থানীয় আরও অনেকে।
এদিকে, সত্যের পথে এমন নির্মম আঘাতে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ। তারা এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।
বুড়িচং থানা পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
এই ঘটনা যেন আরেকবার মনে করিয়ে দেয়—সত্যের প্রতি ভালোবাসা কখনো কখনো বিপদের সঙ্গেই হাত ধরে হাঁটে, তবু থেমে থাকে না সত্যের পথচলা।
