সোমবার, ১২ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রাজুর স্ত্রী’ পরিচয়ে কক্সবাজারের হোটেলে তাজমিন, রেজিস্টারে বয়স ১৮

নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর ১২, ২০২৬ ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

১৫ বছরের স্কুলছাত্রীর নাম ‘তানজু আক্তার’, ৩০২ নম্বর কক্ষে এক রাত | ফেরার পথে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার, অটোরিকশাচালক সুমনের বিরুদ্ধে অভিযোগ। ছবি: সংগৃহীত

ফেসবুকে পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা, এরপর কক্সবাজারে দেখা। মাত্র ১৫ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে উঠেছিলেন ‘রাজুর স্ত্রী’ পরিচয়ে। হোটেলের রেজিস্টারে তাঁর নাম লেখা হয়েছিল ‘তানজু আক্তার’, বয়স উল্লেখ করা হয় ১৮ বছর। গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে কক্সবাজারের কলাতলীতে কুটুমবাড়ি রোডের শেষ মাথায় অবস্থিত মেঘলা রিসোর্টের ৩০২ নম্বর কক্ষে ওঠেন তিনি। পরদিন হোটেল ছেড়ে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হন তাজমিন। কিন্তু বাড়ি ফেরার সেই যাত্রা শেষ হয় ভয়াবহ পরিণতিতে। পুলিশের অভিযোগ, পথে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়া তাঁকে ধর্ষণের পর হত্যা করেন।

কুমিল্লার স্কুলছাত্রী তাজমিন হত্যাকাণ্ডের তদন্তে তাঁর কক্সবাজার যাত্রা, হোটেলে অবস্থান, বাসের টিকিট সংগ্রহ এবং বাড়ি ফেরার শেষ পথ ঘিরে একের পর এক তথ্য সামনে এসেছে। হোটেলের রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে উঠে এসেছে তাঁর যাত্রাপথের বিভিন্ন বিবরণ। তবে রাজুর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি এবং হত্যাকাণ্ডে কারও সম্পৃক্ততার প্রশ্ন পৃথকভাবে তদন্ত করা হচ্ছে।

হোটেলের রেজিস্টারে ‘তানজু আক্তার’, বয়স ১৮

কক্সবাজারের কলাতলীতে কুটুমবাড়ি-সংলগ্ন সড়কের শেষ মাথায় অবস্থিত তিনতলা আবাসিক হোটেল মেঘলা রিসোর্টের রেজিস্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে ৩০২ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেন তাজমিন। সেখানে তাঁকে রাজুর স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। রেজিস্টারে তাঁর নাম লেখা হয় ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স উল্লেখ করা হয় ১৮ বছর। রিয়াজের পরিচয় হিসেবে লেখা হয়, তিনি বান্দরবানের লামা এলাকার মনির আহমদের ছেলে।

হোটেলটির এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এক রাত থাকার পর ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তাঁরা হোটেল ছেড়ে চলে যান। হোটেলের রেজিস্টারে রিয়াজের দুটি মুঠোফোন নম্বর ও একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর লেখা রয়েছে। এর মধ্যে একটি নম্বর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাজমিনের প্রকৃত বয়স ১৫ বছর হলেও হোটেলের রেজিস্টারে ১৮ বছর লেখার বিষয়টি তদন্তের প্রাসঙ্গিক তথ্য হিসেবে সামনে এসেছে। কীভাবে তাঁর পরিচয় ও বয়স নথিভুক্ত করা হয়েছিল, তা সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।

ইনস্টাগ্রামেও যোগাযোগ, পরিচয়ের সময় নিয়ে ভিন্ন তথ্য

অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করেন রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজু। ফেসবুকের পাশাপাশি ইনস্টাগ্রামেও তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল বলে জানা গেছে। নিয়মিত বার্তা আদান-প্রদানের পাশাপাশি তাঁরা পরস্পরকে রিলস পাঠাতেন বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তবে তাঁদের পরিচয়ের সময়কাল নিয়ে বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। রাজুর এক সহকর্মীর দাবি, ফেসবুকের মাধ্যমে ঘটনার প্রায় ১৭ দিন আগে তাজমিনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। অন্যদিকে, রাজুর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের দাবি, প্রায় পাঁচ মাস আগে তাঁদের প্রথম পরিচয় হয়েছিল। এ দুই বক্তব্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

রাজুর এক সহকর্মী জানান, তাজমিন হত্যাকাণ্ডের পর রাজু তাঁর কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এবং তাঁকে বাঁচানোর জন্য আকুতি-মিনতি করেন। হত্যাকাণ্ডে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করেন রাজু। ওই সহকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর রাজু হোটেল ছেড়ে ছুটিতে রয়েছেন।

বাসের টিকিট কেটে তাজমিনকে বিদায়

কক্সবাজারের কক্সেস প্যানোরামিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর এজেন্সির ব্যবস্থাপক আবদুল্লাহ জানান, ৬ অক্টোবর রাত ৮টার পর তাজমিন ও রাজু তাঁদের কাউন্টারে গিয়ে বাসের টিকিট কাটেন। পরদিন কুমিল্লায় ফেরার জন্য আইকনিক এক্সপ্রেসের টিকিট বুক করেন রাজু।

আবদুল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাজমিনকে বাসে তুলে দেন রাজু। বাসটি কুমিল্লার উদ্দেশে কক্সবাজার ছেড়ে যায়। রাজুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাজমিনের টিকিটের দাম ছিল ৯০০ টাকা বলে তাঁর এক সহকর্মী জানিয়েছেন।

এদিকে, সিসিটিভি ফুটেজের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ৭ অক্টোবর রাত পৌনে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা আইকনিক এক্সপ্রেসের বাস থেকে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানের সামনে নামেন তাজমিন। এরপর শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করেন তিনি। কিন্তু সেই যাত্রা আর বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছায়নি।

নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়া (৩৫) তাজমিনকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন। পরদিন সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার একটি ধানখেত থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ঘটনাস্থল হিসেবে জগতপুর ও ভোরালজগপুর উত্তরপাড়া গ্রামের উল্লেখ রয়েছে।

এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, আদালতে হাজির করার পর তিনি হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে।

লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, মুঠোফোনের কললিস্টসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে তদন্ত চলছে। আসামি হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তদন্ত শেষ হলে ঘটনার বাকি বিষয়গুলো জানা যাবে।

বাড়িতে বলেছিলেন বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছেন

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তাজমিন মাকে জানিয়েছিলেন, তিনি এক বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছেন। তবে বান্ধবীর নাম ও তাঁর মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলে তাজমিন কিছু জানাননি।

এর আগে এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে তাঁর ঝগড়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। এরপর তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে যান। পরে কুমিল্লায় ফিরে রিয়াজের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তখন রিয়াজ তাঁকে কক্সবাজারে যাওয়ার জন্য বিকাশের মাধ্যমে ৫০০ টাকা পাঠান।

তাজমিনের মা কেয়া খাতুন জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়েছিল। তখন তাজমিন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে। মেয়েকে বান্ধবীর বাড়ি থেকে নিয়ে আসতে চাইলেও সে কার সঙ্গে আছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাননি।

মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্ব নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন কেয়া খাতুন। কিন্তু মেয়ের কক্সবাজার যাত্রা ও পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানতে পারেননি বলে পরিবারের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

অটোরিকশায় ওঠার পরও রাজুর সঙ্গে কথা?

রাজুর এক সহকর্মীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লায় ফেরার পথে অটোরিকশায় ওঠার পরও তাজমিনের সঙ্গে রাজুর মুঠোফোনে কথা হচ্ছিল। তাজমিন অটোরিকশাচালকের বিস্তারিত তথ্যও তাঁকে জানিয়েছিলেন বলে ওই সহকর্মীর দাবি।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাত দেড়টার দিকে তাজমিনের মুঠোফোনের লাইভ লোকেশন বন্ধ হয়ে গেলে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরদিন বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে তাজমিনের ধর্ষণ ও হত্যার খবর দেখে রাজু স্তম্ভিত হয়ে পড়েন বলে দাবি করেন ওই সহকর্মী।

তিনি আরও জানান, রাজু গত তিন বছর ধরে কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে কাজ করছেন। ঘটনার পর থেকে তাঁর মুঠোফোন বন্ধ থাকায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।

তবে তাজমিনের সঙ্গে রাজুর শেষ কথোপকথনের সময়, অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য এবং তাঁদের যোগাযোগের প্রকৃত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে কললিস্ট, ডিজিটাল তথ্য ও অন্যান্য প্রমাণের তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তদন্তে এখন যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ

তাজমিনের কক্সবাজার যাত্রা, হোটেলের রেজিস্টারে ভিন্ন নাম ও বয়স লেখা, বাসের টিকিট কেনা, ফেরার পথে অটোরিকশায় ওঠা এবং পরবর্তী হত্যাকাণ্ড—সবকিছুই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তাজমিনের সঙ্গে রাজুর সম্পর্ক ও যোগাযোগের বিবরণ একদিকে; অন্যদিকে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে কারা সরাসরি জড়িত, সেটি নির্ধারণের বিষয়টি সম্পূর্ণ পৃথক। পুলিশ সুমন মিয়াকে এ ঘটনায় অভিযুক্ত করেছে এবং তাঁর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির কথা জানিয়েছে। রাজুর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার কোনো তথ্য এখানে নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

তাই হোটেলের নথি, সিসিটিভি ফুটেজ, মুঠোফোনের কললিস্ট, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র উদ্‌ঘাটন করাই এখন তদন্তের প্রধান লক্ষ্য। তাজমিন হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে দায়ীদের ভূমিকা নির্ধারণের ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।