ভাঙচুরের পর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। গত শনিবার তোলা ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর সেকশনে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় গ্রেপ্তার নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। ঘটনার সঙ্গে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির নেতাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলেও এখন পর্যন্ত প্রভাবশালী সদস্যদের কেউ গ্রেপ্তার হননি। গত দুদিনে পুলিশ সমিতির সম্পাদক শাহ আলম গাজীসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের অনেকেই শাহ আলী এলাকার ভাড়াটে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রাড্ডা সেন্টার দখলের ঘটনায় প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন ছিল। তবে পুলিশ বলছে, সিসিটিভি ফুটেজ ও মামলার তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাদেরই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তদন্তে আরও কারও নাম এলে তাদেরও গ্রেপ্তার করা হবে।
গতকাল রোববার দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের ধ্বংসস্তূপের সামনেই দ্বিতীয় দিনেও স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। তবে ধ্বংসযজ্ঞের কারণে কার্যক্রম চলছে সীমিত পরিসরে।
জুলিয়া বেগম নামে এক নারী জানান, ছয় মাস বয়সী মেয়েকে টিকা দিতে তিনি রাড্ডা সেন্টারে এসেছেন। বাসার কাছাকাছি হওয়ায় নিয়মিত এখান থেকেই মেয়েকে টিকা দেন তিনি।
প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, হামলা ও ভাঙচুরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ হামলায় যারা জড়িত, তাদের উপযুক্ত বিচারের দাবি জানাই।
প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, হামলার আগে এ কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ জন সেবা নিতেন। তবে গতকাল সেবা নিয়েছেন মাত্র ৪৭ জন।
ডিএমপির মিরপুর বিভাগের সহকারী কমিশনার জাকির হোসেন বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ ও মামলার তদন্তে সম্পৃক্ততার তথ্যের ভিত্তিতেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তে যাদেরই নাম আসবে, তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।
রাতের আঁধারে হামলা, বসানো হয় সমিতির সাইনবোর্ড
গত বৃহস্পতিবার রাতে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে কয়েকশ লোক জড়ো হয়ে লুটপাট ও ভাঙচুর চালায়। পরে হামলাকারীরা সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড লাগিয়ে চলে যায়।
এ ঘটনায় পরদিন শাহ আলী থানায় মামলা করেন রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার। মামলায় ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য হানিফ মিয়াসহ ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
সমবায় অফিস সূত্রে জানা গেছে, সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি সরকারের নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠান। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করা হয়। এতে সভাপতি মিজানুর রহমান হাজরা, সহসভাপতি কামাল উদ্দিন আহম্মদ, সম্পাদক মজিবুর রহমান গাজী, কোষাধ্যক্ষ কামাল হোসেন এবং ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য হিসেবে মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ, মোহাম্মদ ছাকাওয়াত উল্ল্যাহ, আল-আমিন, কবির হোসেন গাজী ও আবু বকর ছিদ্দিকের নাম রয়েছে।
তবে সমবায় অফিসে জমা দেওয়া ব্যবস্থাপনা কমিটির নথিতে সহসভাপতি পদে ‘কো-অপ্ট’ করা হয় কাজী মকবুল হোসেনকে এবং সম্পাদক পদে শাহ আলম গাজীকে।
সমিতিতে প্রভাবশালী সদস্যদের নাম
সমিতির একাধিক সদস্য ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির বর্তমান সদস্য ৯১ জন। তাদের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেত্রী ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য হানিফ মিয়া, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সদস্য সচিব মোস্তফা জগলুল পাশা পাপেল, আব্দুর রহমান হাজরা, মাহবুবুর রহমান শান্ত ও মনির হোসেন রয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনেই রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ সময় স্থানীয় যুবদল ও ছাত্রদলের নেতারাও বিভিন্ন ভূমিকায় ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ভাঙচুরে অংশ নেওয়া অধিকাংশ ব্যক্তির মুখে মাস্ক ছিল বলে স্থানীয়রা জানান।
এ ছাড়া শাহ স্মৃতি মার্কেটের নুরুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধেও ভাঙচুরে অংশ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গ্রেপ্তার ১০, সবাই কারাগারে
রাড্ডা সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় পুলিশ সমিতির সম্পাদক শাহ আলম গাজীসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন—শাহাদাত হোসেন, কাজী মকবুল হোসেন, আতিকুর রহমান, কামরুল ইসলাম, শাকিল, সোহেল, জুয়েল, জিহাদ হাসান ও রাব্বি।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার সবাইকে আদালতে পাঠানো হলে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
১৪ জন দুই অংশেরই সদস্য
মিরপুর-১ নম্বরে ১০ কাঠা জমির ওপর স্থাপিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার একটি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে প্রায় ৫০ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি গরিব ও অসহায় মা-শিশুদের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নিয়ে নব্বইয়ের দশকে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড গঠিত হয়। ২০০১ সালের দিকে সমিতিটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়। একই রেজিস্ট্রেশন থাকলেও দুটি কমিটি করা হয়।
এক অংশে বর্তমানে সদস্য ৫৬ জন। তবে বর্তমানে ওই অংশের কোনো কমিটি নেই। অন্য অংশের সভাপতি মিজানুর রহমান হাজরা। এ কমিটির অধীনে সমিতির সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিসহ ৯১ জন। এর মধ্যে ১৪ জন দুই অংশেই রয়েছেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০০৬ সালে সমিতি জমিটি বরাদ্দ পায়। তৎকালীন স্থানীয় কাউন্সিলর ও সমিতির সদস্য মিষ্টি বরাদ্দের টাকাও জমা দেন। ২০২১ সালের দিকে সমিতির নামে জমিটি রেজিস্ট্রেশন হয়। তবে জমিটির দখল নেওয়া হয়নি। এরই মধ্যে সমিতির অন্য অংশ আদালতে মামলা করে। মামলাটি বর্তমানে চলমান।
লুটের মাল যাচ্ছে ভাঙাড়ির দোকানে!
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, রাড্ডা সেন্টারের বিভিন্ন কক্ষের আসবাব ও যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করা হয়। আলট্রাসনোগ্রাম, টিকাদান ও ল্যাবরেটরি কক্ষের দরজা-জানালা ভেঙে ফেলা হয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন ওষুধ ও সামগ্রী, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্রিজ, এসি ও স্টিলের আলমারি নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, লুট হওয়া মালপত্রের কিছু অংশ স্থানীয় কয়েকটি ভাঙাড়ির দোকানে পাওয়া গেছে।
ভাঙচুরের সময় ব্যবহৃত এক্সক্যাভেটরটি স্থানীয় এক ছাত্রদল নেতা নিয়ে এসেছিলেন বলেও স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ। ঘটনার সময় একটি গাড়িতে করে স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের নেতারা আশপাশে অবস্থান করছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে। ঘটনার সময়ের একটি সিসিটিভি ফুটেজে সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাস দেখা গেছে।
এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নিশ্চিত করতে আরও তদন্ত প্রয়োজন।
দায়িত্বে গাফিলতি, প্রত্যাহার ওসি
রাড্ডা সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় গত শনিবার পুলিশ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটিকে শনিবারই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে শাহ আলী থানার তৎকালীন ওসি জাহাঙ্গীর আলমের দায়িত্ব পালনে গাফিলতির বিষয় উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তদন্ত কমিটির সূত্র অনুযায়ী, রাড্ডা সেন্টার দখলের বিষয়টি সদ্য সাবেক ওসি জাহাঙ্গীর আলম জানতেন। কিন্তু তিনি এ বিষয়ে আইনি কোনো পদক্ষেপ নেননি। এমনকি বিষয়টি যথাসময়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও জানাননি। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে ঘটনার খবর পাওয়ার বেশ কিছু সময় পর তিনি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে তাঁর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সুপারিশ করা হবে বলেও তদন্ত কমিটির সূত্র জানিয়েছে।
এরই মধ্যে ঘটনার দুই দিন পর গতকাল ‘প্রশাসনিক কারণ’ দেখিয়ে শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তাঁকে কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।
ধ্বংসস্তূপ দেখে মর্মাহত প্রতিমন্ত্রী
প্রয়োজনীয় সংস্কার করে সোমবার থেকেই রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু করা হবে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।
রোববার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে তিনি বলেন, প্রায় ৫০ বছর ধরে এলাকার অসহায় ও দরিদ্র মানুষের সেবা দিয়ে আসা এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম কোনোভাবেই ব্যাহত হতে দেওয়া হবে না। সোমবার থেকেই কেন্দ্রটির সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।
তিনি বলেন, কারও কোনো আইনি দাবি থাকলে আদালত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা উত্থাপন করতে পারে। রাতের অন্ধকারে বুলডোজার দিয়ে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভেঙে ফেলার অধিকার কারও নেই।
‘এমপির নেতৃত্বে ধ্বংসযজ্ঞ’—আসিফ মাহমুদ
দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, বিএনপির একজন সংরক্ষিত নারী আসনের এমপির নেতৃত্বে সেখানে ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটতরাজ চালানো হয়েছে এবং একটি ‘মবতন্ত্র’ কায়েম করা হয়েছে—এমনটাই তাঁরা দেখেছেন।
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, গরিব মানুষের শিশুদের টিকা ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র লুট করে কী প্রমাণ করা হচ্ছে?
রোববার দুপুর ১২টার পর আসিফ মাহমুদের নেতৃত্বে এনসিপির একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এ সময় সেখানে লাগানো ‘সমমনা দোকানদার সমিতি লিমিটেড’-এর একটি সাইনবোর্ড এনসিপির কর্মীরা ভেঙে ফেলেন। আরেকটি সাইনবোর্ড কালো কালি দিয়ে মুছে দেওয়া হয় এবং একটি ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হয়।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তাসনিম জারার
রাড্ডা সেন্টার পরিদর্শন শেষে চিকিৎসক ও রাজনীতিক তাসনিম জারা বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ভেঙে দেওয়ার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, কয়েক ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর চলার পরও পুলিশ কেন তা ঠেকাতে পারেনি? এমন পরিস্থিতি থাকলে মানুষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর কীভাবে আস্থা রাখবে?
পুরো ঘটনাটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করার আহ্বান জানান তিনি।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার দখল, হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় এখন মূল প্রশ্ন—ঘটনার নেপথ্যে কারা ছিলেন, কার নির্দেশে এত বড় হামলা হলো এবং গ্রেপ্তারের তালিকায় প্রভাবশালী অভিযুক্তদের নাম কবে আসবে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপরই নির্ভর করছে।
