সহানুভূতি, সময় ও মনোযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান—দেশে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়তে কাজ করছে সরকার। ছবি সংগৃহীত
রোগীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে শুধু ভালো চিকিৎসা কিংবা নির্ভুল ব্যবস্থাপত্রই যথেষ্ট নয়; চিকিৎসকের আচরণেও আনতে হবে বড় ধরনের পরিবর্তন। রোগীর সঙ্গে সহানুভূতিশীল, মানবিক ও আন্তরিক আচরণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।
শুক্রবার রাজধানীর নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে (এনএসইউ) বাংলাদেশ মেডিকেল স্টুডেন্টস সোসাইটির (বিএমএসএস) আয়োজনে জাতীয় সাধারণ সভা (এনজিএ) ২০২৬-এ বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ‘ওয়ান প্লেজ, ওয়ান বন্ড: ডক্টরস রাইটস অ্যাবাভ অল’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৯৫০ জন মেডিকেল শিক্ষার্থী, তরুণ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য পেশাজীবী অংশ নেন।
‘শুধু ব্যবস্থাপত্র নয়, রোগীর প্রয়োজন ভরসার জায়গা’
চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে রোগীদের অন্যতম বড় অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, চিকিৎসকেরা অনেক সময় রোগীদের পর্যাপ্ত সময় দেন না। রোগীদের সঙ্গে যথাযথ আচরণও করা হয় না। এ জায়গায় পরিবর্তন আনা জরুরি।
তিনি বলেন, ধৈর্য, আন্তরিক আচরণ, শারীরিক উপস্থিতি ও গভীর মনোযোগের মাধ্যমে রোগীদের মনের ক্ষোভ দূর করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, বুকভরা আশা নিয়েই রোগীরা চিকিৎসকের কাছে আসেন। তারা ভালো আচরণ, যথাযথ মনোযোগ ও নির্ভুল ব্যবস্থাপত্রের পাশাপাশি চিকিৎসকের কাছে একটি ভরসার জায়গা চান।
তাই চিকিৎসকদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—মানুষের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা।
ধাপে ধাপে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে রেফারেল ব্যবস্থা
গ্রামীণ পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম আরও জোরদারে সরকার সমন্বিতভাবে কাজ করছে বলেও জানান অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।
তিনি বলেন, প্রথম সারির স্বাস্থ্যকর্মী, পরিবার পরিকল্পনা কর্মী ও কমিউনিটি পর্যায়ের কর্মীরা সমন্বিতভাবে কাজ করবেন। প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীকে ইউনিয়ন পর্যায় থেকে উপজেলা, জেলা হাসপাতাল এবং পর্যায়ক্রমে উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি বলেন, আমরা একটি চমৎকার ও কার্যকর রেফারেল সিস্টেম গড়ে তুলতে চাই। এই মুহূর্তে স্বাস্থ্য খাতের জন্য এটি সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
গবেষণায় ঘাটতি, এগিয়ে আসতে হবে চিকিৎসকদের
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, গবেষণা একজন সাধারণ চিকিৎসককে একজন উদ্ভাবকে পরিণত করতে পারে। স্বাস্থ্য খাতের মতো বড় একটি ক্ষেত্র গবেষণা ছাড়া এগিয়ে যেতে পারে না।
তার মতে, বাংলাদেশে হাজার হাজার রোগ নিয়ে কাজ হলেও চিকিৎসার ক্ষেত্রে অনেক সময় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক তথ্য-উপাত্তের ওপর নির্ভর করতে হয়। দেশের রোগের প্রকোপ, বিস্তার ও চিকিৎসা নিয়ে নিজস্ব তথ্য-উপাত্ত এখনো পর্যাপ্ত নয়।
এই ঘাটতি পূরণে চিকিৎসকদের আরও বেশি গবেষণায় যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তরুণ চিকিৎসকদের দক্ষতা ও নেতৃত্বে গুরুত্ব
বাংলাদেশে ইউনেস্কোর প্রতিনিধি ও হেড অব অফিস ডা. সুসান ভাইজে বলেন, গত বছরও তিনি এ আয়োজনে অংশ নিয়েছিলেন। ছোট পরিসরে শুরু হওয়া আয়োজনটি এখন বড় পরিসরে রূপ নিয়েছে।
চিকিৎসকদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি পেশাগত উন্নয়নে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ক্লিনিক্যাল দক্ষতা, জনস্বাস্থ্য, গবেষণা, ক্যারিয়ার উন্নয়ন, মানবাধিকার ও চিকিৎসকদের পেশাগত অধিকার—সবকিছুকে গুরুত্ব দিয়ে আয়োজনটি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তরুণ স্বাস্থ্য পেশাজীবীরা শেখার পাশাপাশি যোগাযোগ ও নেতৃত্বের সুযোগ পাবেন।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ডা. আব্দুল হান্নান চৌধুরী, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেসের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম, শান্তি ক্যান্সার ফাউন্ডেশনের প্রধান পরামর্শক ডা. পারভীন শহীদা আক্তার এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ডা. নাসার উ. আহমেদসহ চিকিৎসা, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য খাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
হাম-ডেঙ্গু থেকে ট্রমা চিকিৎসা—আলোচনায় নানা সংকট
এনজিএ ২০২৬-এর বিভিন্ন থিমেটিক সেশন ও প্যানেল আলোচনায় চিকিৎসা ও ডেন্টাল শিক্ষার পরিবর্তন, হাম ও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা, প্রজননস্বাস্থ্য ও অধিকার, নগর ও শরণার্থী পরিস্থিতিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য গবেষণা এবং নারীর স্বাস্থ্য, অধিকার ও নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে।
ক্লিনিক্যাল ও ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেশনে আকস্মিক হৃদ্যন্ত্রজনিত জরুরি পরিস্থিতির প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা, ডুবে যাওয়ার ঘটনা মোকাবিলা, এটিএলএসভিত্তিক ট্রমা ব্যবস্থাপনা, আধুনিক ডায়াবেটিস চিকিৎসা এবং প্রসূতিজনিত জরুরি অবস্থা মোকাবিলা নিয়ে আলোচনা হয়।
পাশাপাশি হাতে-কলমে সেলাই বা স্যুচারিং সেশন এবং দন্ত চিকিৎসাবিষয়ক বিশেষ সেশনেরও আয়োজন করা হয়।
চিকিৎসার বাইরেও ক্যারিয়ারের নতুন দিগন্ত
ম্যাপিং দ্য হোয়াইট কোট: এক্সপ্লোরিং ক্যারিয়ার পাথওয়েজ অ্যাক্রস ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস, রিসার্চ, একাডেমিয়া অ্যান্ড গ্লোবাল মেডিসিন’ শীর্ষক সেশনে চিকিৎসকদের ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসের পাশাপাশি গবেষণা, একাডেমিয়া ও গ্লোবাল মেডিসিনে ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
সব মিলিয়ে এনজিএ ২০২৬-এর আলোচনায় উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—রোগীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে চিকিৎসাব্যবস্থার আধুনিকায়নের পাশাপাশি বদলাতে হবে চিকিৎসক-রোগীর সম্পর্কের ধরনও। আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে দক্ষতা, গবেষণা ও কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে উঠলে দেশের স্বাস্থ্যসেবায় আরও আস্থাশীল ও সমন্বিত কাঠামো তৈরি হবে।
