ফাইল ছবি
দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠের ওপর সারি সারি সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল—কিন্তু তার নিচে বন্ধ হচ্ছে না চাষাবাদ। জমির মালিকানা বা কৃষিকাজ হারানোর কোনো শঙ্কা ছাড়াই উত্তরবঙ্গের অবহেলিত জনপদে জ্বালানি খাতের এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে ‘রংপুর সোলার পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেড’ (RSPPL)। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে ৩৫০ একর জমিতে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই ‘এগ্রোভোল্টাইক’ সোলার প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে যোগ হবে নতুন মাত্রা।
উত্তরবঙ্গের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও জাতীয় গ্রিডে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি যুক্ত করার লক্ষ্যে বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে রংপুর সোলার পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেড’ (RSPPL)। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী ইউনিয়নে ৩৫০ একর জমিতে ১০০ মেগাওয়াট (MW) ক্ষমতাসম্পন্ন একটি আধুনিক এগ্রোভোল্টাইক সোলার পাওয়ার প্লান্ট’ স্থাপনের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
প্রকল্পটির জমি নির্বাচন, চুক্তি সম্পাদন ও প্রকল্প এলাকার সরেজমিন পরিদর্শনের কাজ ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। সেই সঙ্গে বিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্ধারিত স্থানটিতে কোম্পানির আনুষ্ঠানিক তথ্য সংবলিত সাইনবোর্ডও স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এবং প্রাথমিক কাজের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
কৃষি ও সৌরবিদ্যুতের অনন্য সমন্বয়: এগ্রোভোল্টাইক প্রযুক্তি
ঐতিহ্যগত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ধারণার বাইরে গিয়ে পরিবেশবান্ধব ‘এগ্রোভোল্টাইক’ (Agrivoltaic) প্রযুক্তির ওপর জোর দিয়েছে কোম্পানিটি। এই প্রযুক্তির ফলে জমি কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; সোলার প্যানেলের নিচে এবং মধ্যবর্তী স্থানে একই সঙ্গে আধুনিক কৃষিকাজ ও পশুপালন পরিচালিত হবে।
এর ফলে এলাকার কৃষিজমির স্বাভাবিক ব্যবহার ও উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত হবে। বিশেষ করে, প্রকল্পের জমির মালিকরাই প্যানেলের নিচের অংশে নিজ দায়িত্বে চাষাবাদ অব্যাহত রাখবেন এবং উৎপাদিত শস্যের সুরক্ষায় কোম্পানির পক্ষ থেকে সব ধরনের আধুনিক প্রযুক্তিগত ও সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করা হবে।
কুড়িগ্রাম ও রংপুরে প্রসারিত হচ্ছে মাস্টারপ্ল্যান
শুধুমাত্র লালমনিরহাটেই থেমে থাকছে না এই বৃহৎ উদ্যোগ। উত্তরবঙ্গের জ্বালানি সংকট নিরসন ও টেকসই উন্নয়নের জন্য রংপুর সোলার পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেড তাদের পরিধি আরও বিস্তৃত করছে। এর মধ্যে রয়েছে—রংপুর (গঙ্গাচড়া): গঙ্গাচড়া এলাকায় জমি পরিদর্শনের কাজ শেষ হয়েছে এবং স্থান নির্ধারণ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
কুড়িগ্রাম (চিলমারী ও কুড়িগ্রাম সদর): কুড়িগ্রামের চিলমারী এবং সদর উপজেলার আশপাশে একাধিক উপযুক্ত জমি নির্বাচন করা হয়েছে, যেখানে ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমে আরও কয়েকটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইমরান আলি বলেন, উত্তরবঙ্গ দীর্ঘকাল ধরে শিল্পায়ন ও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের দিক থেকে পিছিয়ে ছিল। আমরা বিশ্বাস করি, বিদেশি অর্থায়নের মাধ্যমে স্থাপিত লালমনিরহাটের ১০০ মেগাওয়াট এগ্রোভোল্টাইক সোলার প্রকল্প আমাদের সেই লক্ষ্য পূরণের প্রথম ধাপ। এই প্রকল্পের অন্যতম মূল বৈশিষ্ট্য হলো—জমির মালিকরাই সোলার প্যানেলের নিচে নিজেদের জমিতে চাষাবাদ করবেন এবং শস্য উৎপাদনে আমরা তাদের সব ধরনের সহায়তা দেব। পাশাপাশি, জমিদাতা পরিবারের যোগ্য ও দক্ষ প্রার্থীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিভিন্ন কর্মকর্তা ও কর্মচারী পদে চাকরি দিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) ইঞ্জিনিয়ার হিল্লোল বাউলিয়া বলেন, আমরা কারিগরি ও কৌশলগত সব দিক বিবেচনা করেই লালমনিরহাটের ভোটমারীতে ৩৫০ একর জমি নির্বাচন ও চুক্তি চূড়ান্ত করেছি। আমাদের নীতি অত্যন্ত স্পষ্ট: জমিদাতাদের স্বার্থ সর্বাগ্রে সংরক্ষিত থাকবে। সোলার প্যানেলের নিচের জমিতে আমাদের তত্ত্বাবধানে ও সহযোগিতায় জমিদাততারাই চাষাবাদ চালিয়ে যাবেন।
প্রকল্পটি নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ভোটমারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, এই মেগা প্রকল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো জমির মালিকরা তাদের মালিকানা হারানোর ভয় তো নেই-ই, বরং তারা নিজ জমিতেই সোলার প্যানেলের নিচে চাষাবাদ চালিয়ে যেতে পারবেন। ১০০ মেগাওয়াটের এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং এগ্রোভোল্টাইক প্রজেক্ট আমাদের এলাকার চিত্র বদলে দেবে।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রামে এই মেগা সোলার প্রজেক্টগুলো বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে এবং পরিচ্ছন্ন ও টেকসই বাংলাদেশ গঠনে এটি এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্যের পেতে RSPPL-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ভিজিট করলে এসব বিষয় অবগত হবেন।
