জাতীয় সংসদের গাম্ভীর্য ভেঙে হঠাৎ নেমে এসেছিল এক অদ্ভুত নীরবতা—মাইক্রোফোন যেন হারিয়ে ফেলেছিল তার কণ্ঠস্বর, আর সেই নিস্তব্ধতার মাঝেই জন্ম নেয় তুমুল বিতর্ক। সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেনকে অবশেষে বদলি করা হয়েছে—ঘটনার পর্দা যেন আরও রহস্যে ঢেকে গেল।
বুধবার (১ এপ্রিল) গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, জনস্বার্থে আনোয়ার হোসেনকে গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-১২, ঢাকায় বদলি করা হয়েছে। তাকে আগামী ২ এপ্রিলের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় ৫ এপ্রিল থেকে তাকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) হিসেবে গণ্য করা হবে।
ঘটনার শুরুটা যেন এক নাটকীয় দৃশ্য—গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন। দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী মঞ্চে হঠাৎ করেই ভেঙে পড়ে প্রযুক্তির আস্থা। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কণ্ঠ আটকে যায় যান্ত্রিক ত্রুটির ফাঁদে। একসময় বাধ্য হয়ে তিনি হাতে তুলে নেন হ্যান্ডমাইক—যেন আধুনিকতার মুখোশ খুলে পড়ে অতীতের এক দৃশ্য।
এই বিব্রতকর মুহূর্ত শুধু সংসদ কক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, তৈরি হয় সমালোচনার ঝড়। ১৪ মার্চ প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে ‘অদক্ষ হাতে সংসদের সাউন্ড’—যা প্রশাসনের ভেতরেও নাড়া দেয় তীব্রভাবে। এরপর থেকেই ঘটনাটি যেন এক অজানা রহস্যকাহিনীর মোড় নেয়। এটি কি কেবলই যান্ত্রিক ত্রুটি, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো অন্তর্ঘাত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ২৮ মার্চ গঠন করা হয় একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি, যাদের আগামী ৩ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।
এদিকে তদন্তের উত্তাপ পুরোপুরি স্তিমিত হওয়ার আগেই—মাত্র চার দিনের ব্যবধানে—দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর এই বদলি নতুন করে জন্ম দিয়েছে নানা জল্পনা। এটি কি কেবল প্রশাসনিক রুটিন, নাকি দায় এড়ানোর সূক্ষ্ম কৌশল? তবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সূত্র বলছে, ভবিষ্যতে যেন আর কোনোদিন সংসদের কণ্ঠ স্তব্ধ না হয়—সেই লক্ষ্যেই নেওয়া হবে স্থায়ী সমাধান। তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—সংসদের মাইকে যে নীরবতা নেমে এসেছিল, তা কি শুধুই প্রযুক্তির ব্যর্থতা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও গভীর কোনো গল্প?
