মুক্তা ইসলাম মাওয়া, দুই সন্তান ও সোহেল শিকদার। ছবি-সংগৃহীত
সেই দুই শিশুকে এখন ঘুম পাড়াতে কষ্ট,আম্মু যাব, আম্মু যাব’—রাতে ঘুম ভেঙেই কান্না; ভাত-পানি খেতে চায় না সাফওয়ান-তাসফিয়া
‘দুই ভাইবোন ভাত-পানি কিছু খাইতে চায় না। চিপস, জুস দিলে একটু নেয়। দিনে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলা করে কাটায়। রাতে ঘুম ভেঙে গেলে শুধু কইতে থাকে—“আম্মু যাব, আম্মু যাব। হাত-পা ছুড়ে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। ওদের ঘুম পাড়িয়ে রাখা কষ্ট হয়ে যায়।’
কথাগুলো বলতে বলতেই চোখে পানি এসে যায় মিনারা বেগমের। শিশু দুটি তাঁর মেয়ে মুক্তা ইসলাম মাওয়ার। গত ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর খিলক্ষেতের একটি বাসা থেকে মুক্তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে স্বামীর হাতে তিনি বর্বর নির্যাতনের শিকার হন।
বরিশালের বাকেরগঞ্জের শরসী এলাকার বাসিন্দা মিনারা বেগম। এখন তাঁর কাছেই থাকছে মুক্তার ৫ বছরের ছেলে সাফওয়ান শিকদার ও ৪ বছরের মেয়ে তাসফিয়া শিকদার। গতকাল বুধবার ফোনে কথা হয় তাঁর সঙ্গে।
মেয়েকে হারিয়ে পাগলপ্রায় মিনারা বেগম। আগে থেকেই নানা রোগে ভুগছিলেন তিনি। মেয়ের মৃত্যুর পর আরও ভেঙে পড়েছেন। একদিকে নিজের শারীরিক অসুস্থতা, অন্যদিকে মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত দুই শিশুকে কীভাবে সামলাবেন—এ নিয়েই এখন তাঁর দুশ্চিন্তার শেষ নেই।
‘মেয়েটাকে এভাবে হারাতে হবে, কল্পনাতেও ছিল না’
রাজধানীর খিলক্ষেতের ৫ নম্বর সড়কের একটি বাড়ির তৃতীয় তলা থেকে মুক্তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এর তিন দিন আগে মুক্তাকে শিকল দিয়ে খাটের সঙ্গে বেঁধে নির্মমভাবে পেটান তাঁর স্বামী সোহেল শিকদার। তখন পাশের রুমে কাঁদছিল তাঁদের দুই সন্তান সাফওয়ান ও তাসফিয়া।
সেই সময় মুক্তা তাঁর স্বামীকে বলেছিলেন, ‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি।’
কিন্তু সন্তানদের ঘুম পাড়ানোর সেই মায়ের আর ঘরে ফেরা হয়নি। কয়েক দিন পরই তাঁর লাশ উদ্ধার হয়।
গতকাল মিনারা বেগম বলেন, ‘মেয়েটাকে এভাবে হারাতে হবে, এটা কল্পনাতেও ছিল না। এভাবে এত কিছু হয়ে যাবে, আমরা বুঝিনি। শরীরের ওপর কী নির্যাতনটা চালানো হয়েছে! আমার শরীরও খারাপ।’
নির্যাতনের ভিডিও পাঠানো হয়েছিল ভাইয়ের ফোনে
মুক্তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সোহেল শিকদার বেল্ট দিয়ে পিটিয়ে মুক্তার পুরো শরীর রক্তাক্ত জখম করে প্রায় তিন মিনিটের একটি ভিডিও ধারণ করেন। পরে সেটি মুক্তার ভাই তারেক হাওলাদারের মোবাইল ফোনে পাঠানো হয়।
তারেক গতকাল সমকালকে বলেন, ১ আগস্ট রাত ৮টার দিকে সোহেল শিকদার ফোন করে তাঁর বোনকে খিলক্ষেতের বাসা থেকে বাকেরগঞ্জে নিয়ে যেতে বলেন।
‘কী হয়েছে—জানতে চাইলে সোহেল বলেন, আজ রাতেই মুক্তাকে নিয়ে যাও। তখন বোনজামাইকে বুঝিয়ে বলছিলাম, একটা দিন সময় দেন। এরপর মাকে নিয়ে ঢাকায় আসব।’
তারেক জানান, কথা বলার একপর্যায়ে সোহেল বলেছিলেন, ৫ বছরের ছেলে সাফওয়ানকে তিনি তাঁর কাছে রাখবেন। আর ৪ বছরের মেয়ে তাসফিয়াকে মুক্তার সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে।
‘এটা জানার পর মনে হয়েছিল, হয়তো রাগ কমলে সব ঠিক হয়ে যাবে। যেহেতু ভাগনেকে সোহেল তাঁর কাছে রাখতে চেয়েছেন, তাই বিশ্বাস ছিল—ঝগড়া হলেও মিটমাট হবে।’
চাকরির নিয়োগপত্র আনতে গিয়ে পেলেন বোনের মৃত্যুসংবাদ
তারেক জানান, সেনাবাহিনীর সৈনিক পদে মনোনীত হয়েছিলেন তিনি। নিয়োগপত্র আনতে ৩ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে বিকেল পর্যন্ত বরিশাল সেনানিবাসে ছিলেন। এ কারণে সারাদিন তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল।
সন্ধ্যার পর মাকে নিয়ে বাসে করে ঢাকায় বোনের বাসার উদ্দেশে রওনা হন তারেক। বরিশাল শহর থেকে বাস কিছুদূর আসার পর ঢাকা থেকে স্বজনরা ফোন করেন। প্রথমে তাঁকে কিছু বলতে চাননি তারা। চাপাচাপি করলে শুধু মন শক্ত রাখার কথা বলতে থাকেন।
‘তখন মনে নানা শঙ্কা উঁকি দিচ্ছিল। একপর্যায়ে ঢাকা থেকে এক চাচাতো বোন জানান, মুক্তা আর নেই। তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না। আরও এক আত্মীয় একই কথা জানান। এরপরই চলন্ত বাসের মধ্যে অচেতন হয়ে পড়ি।’
ওই সময় তারেক ও তাঁর মাকে ধরাধরি করে বাস থেকে নামানো হয়। কিছু সময় পর জ্ঞান ফিরলে মাকে নিয়ে বরিশাল থেকে বাকেরগঞ্জের দিকে রওনা হন তিনি।
তারেক বলেন, ‘বাসে পাশের সিটে থাকলেও তখনও আমার মা বুঝতে পারেননি মুক্তার কী হয়েছে। গ্রামে ফিরে আসার পর ধীরে ধীরে টের পান। ততক্ষণে ঢাকা থেকে বোনের লাশ নিয়ে আত্মীয়স্বজনরা রওনা দিয়েছিলেন।
বোনের সংসারের জন্য সাধ্যের বাইরেও চেষ্টা
তারেক বলেন, ১৬ বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার পর তাঁর মা চার ভাইবোনকে বড় করেছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনিও সংসারের হাল ধরেন। কয়েক বছর ধরে মুন্সীগঞ্জে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন।
‘কয়েক দিন আগে মুক্তা তাঁর স্বামী-সন্তান নিয়ে মুন্সীগঞ্জে আমার বাসায় বেড়াতে গিয়েছিল। ১৫ দিন ছিল। তখন সোহেল শিকদার ব্যবসা করার কথা বলে আমার কাছে তিন লাখ টাকা চেয়েছিলেন। কিছুদিন অপেক্ষার পর গ্রামে গিয়ে ঋণ করে টাকা দেব বলে জানিয়েছি।’
বোনের সংসারে সুখের জন্য অভাব-অনটনের মধ্যেও ভাই হিসেবে সাধ্যের বাইরেও কিছু করার চেষ্টা করতেন বলে জানান তারেক। তাঁর সরকারি চাকরি হওয়ায় মুক্তাও খুব খুশি ছিলেন।
ঈদের সময় মায়ের সামনেও মারধরের অভিযোগ
তারেক বলেন, গত ঈদের সময় খিলক্ষেতে মুক্তার বাসায় ছিলেন তাঁদের মা মিনারা বেগম। তখন তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে তাঁর সামনেই মুক্তাকে পিটিয়ে আহত করেন সোহেল।
মুক্তার পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, স্ত্রীকে দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতন করা হচ্ছিল। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ এবং যৌতুকের দাবিকে কেন্দ্র করে কয়েক মাস ধরে মুক্তার ওপর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ রয়েছে সোহেলের বিরুদ্ধে।
লাশ উদ্ধারের পরও পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন
মুক্তার পরিবারের সদস্যরা জানান, মুক্তার লাশ উদ্ধারের পর খিলক্ষেতের বাসায় পুলিশ গেলে সোহেল তাঁর এক আত্মীয়কে মুক্তার বোন হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। ময়নাতদন্তের সময়ও ওই পরিচয় ব্যবহার করা হয় বলে পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ।
মুক্তার মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর ভাই তানভীর রহমান বাদী হয়ে খিলক্ষেত থানায় মামলা করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাজীব ভৌমিক সমকালকে জানান, মুক্তার স্বামী সোহেল পুলিশকে ফোন করে ঘটনাটি জানান। এরপর পুলিশ তাঁদের বাসায় যায়। নারী পুলিশ সদস্য সুরতহাল করেন। বাসায় গিয়ে মেঝেতে লাশ পাওয়া যায়। মুক্তার সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল দাবি করেন, সিলিং ফ্যানে ঝুলে আত্মহত্যা করেন মুক্তা। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর হত্যা নাকি আত্মহত্যা—তা পরিষ্কার হবে বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা।
ঘটনার দিনই সোহেলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁকে পাঁচ দিনের হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চাওয়া হয়েছে।
সাত বছরের সংসারে নির্যাতনের অভিযোগ
বাকেরগঞ্জের একই এলাকার বাসিন্দা সোহেল শিকদারের সঙ্গে সাত বছর আগে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় মুক্তার। এরপর খিলক্ষেতে স্বামীর সঙ্গে বসবাস করতেন তিনি।
মুক্তার স্বামী শুরুতে খিলক্ষেত এলাকায় মুদি দোকান করতেন। সেই ব্যবসায় ঘুরে দাঁড়াতে না পেরে পরে এমব্রয়ডারি ব্যবসায় জড়ান। সেখানেও ভালো করতে পারেননি। এরপর শ্বশুরবাড়ি থেকে যৌতুক চাওয়া শুরু করেন বলে অভিযোগ পরিবারের।
এর পাশাপাশি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহের জেরেও মুক্তাকে কয়েক মাস ধরে নির্যাতন করা হচ্ছিল বলে পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ।
‘আম্মু যাব’—মায়ের অপেক্ষায় দুই শিশু
মুক্তা নেই। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া দুই সন্তান এখনও যেন মায়ের ফেরার অপেক্ষায়।
দিনের বেলা অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলা করে সময় কাটালেও রাত নামলেই বদলে যায় তাদের আচরণ। ঘুম ভেঙে গেলে মায়ের কথা মনে পড়ে। তখন কান্নায় ভেঙে পড়ে সাফওয়ান ও তাসফিয়া—‘আম্মু যাব, আম্মু যাব।’
মিনারা বেগমের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মেয়েকে হারানোর শোক কীভাবে সামলাবেন, আর কীভাবেই বা এই দুই শিশুকে সামলাবেন?
পায়ে শিকল বেঁধে স্ত্রীকে ভয়াবহ নির্যাতনের ঘটনায় মঙ্গলবার সমকালের প্রথম পাতায় ‘মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ঘটনাটি অসংখ্য মানুষের হৃদয় নাড়া দেয়। মায়ের শেষ আকুতির সেই কথাই এখন যেন দুই শিশুর রাতের কান্নায় ফিরে ফিরে আসছে।
