ইউপি চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন রুহুল। ছবি: সমতল মাতৃভূমি
কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়নে ২৪ জন রোহিঙ্গা নাগরিককে টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশি হিসেবে জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) তদন্ত দল। এ ঘটনায় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন রুহুল এবং ইউপি সচিব নজরুল ইসলামের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
গত ২৯ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদনটি কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের দপ্তরে জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা নাগরিকদের জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতি ব্যক্তির কাছ থেকে গড়ে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা নেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত দল।
সালাহউদ্দিন রুহুল দেবিদ্বার উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা কামরুজ্জামান মাসুদের অনুপস্থিতিতে ইউপি সদস্য সালাহউদ্দিন রুহুল ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান।
তিনটি জন্মনিবন্ধন নিয়ে অভিযোগ, তদন্তে বেরিয়ে আসে আরও তথ্য
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৪ জানুয়ারি রোহিঙ্গা নাগরিক সাইমুন ইসলাম সাজ্জাদ, মুবিনা খাতুন ও হাফিছার নামে বাংলাদেশি জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
এরপর গত ৭ জুলাই স্থানীয় এক বাসিন্দা রেজিস্ট্রার জেনারেল (জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন) কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা শাখার বিশেষ নজরদারি উইং তদন্ত শুরু করে।
তদন্ত প্রতিবেদনে শুধু জন্মনিবন্ধন জালিয়াতিই নয়, দায়িত্ব পালনে ইউপি চেয়ারম্যান ও সচিবের অবহেলার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি চাল আত্মসাৎ এবং ইউনিয়নের উন্নয়নমূলক কাজে অনিয়মের অভিযোগের কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তিন সনদ বাতিলের উদ্যোগ, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার সুপারিশ
কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের উপপরিচালক (স্থানীয় সরকার) মো. মেহেদী মাহমুদ আকন্দ বলেন, প্রথমে তিনটি জন্মনিবন্ধনের বিষয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর ওই তিনটি জন্মনিবন্ধন বাতিলের জন্য রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
একই সঙ্গে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সরকার বিভাগেও চিঠি পাঠানো হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও জন্মনিবন্ধনের বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া গেলে বিস্তারিত তদন্তের জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (শিক্ষা) প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অশোক বিক্রম চাকমা বলেন, একটি প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে। জেলা প্রশাসক সেটি রেজিস্ট্রার জেনারেল (জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন) কার্যালয়ে পাঠাবেন। রেজিস্ট্রার জেনারেলের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বক্তব্য মেলেনি চেয়ারম্যানের, অসুস্থ সচিব
তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন রুহুলকে একাধিকবার ফোন করা হয়। তাঁর হোয়াটসঅ্যাপেও বার্তা পাঠানো হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে ইউপি সচিব নজরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে ফোন করা হলে তাঁর স্ত্রী পরিচয়ে এক ব্যক্তি জানান, নজরুল ইসলাম অসুস্থ এবং মানসিকভাবে চাপের মধ্যে রয়েছেন।
কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মিজ রোজী আক্তার বলেন, জন্মনিবন্ধন নিয়ে পাওয়া অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অবৈধ বা অনিয়মের মাধ্যমে করা জন্মনিবন্ধন বাতিলের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নেওয়া হবে।
এখন তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা ২৪ জনের জন্মনিবন্ধন কীভাবে করা হয়েছিল, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং আর কতজন এভাবে জন্মনিবন্ধন পেয়েছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর সংশ্লিষ্টদের।
