জুলাইয়ের আন্দোলন ‘ভাই-ব্রাদার কোরাম আর শিবিরের হাতে বন্দী’ করার অভিযোগ। উমামা ফাতেমা
জুলাইয়ের আন্দোলনকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে বন্দী করার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা। তাঁর দাবি, আন্দোলনের সময় বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনকে বাদ দিয়ে শিবির ও ছাত্রশক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ক কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এর ফলেই ৫ আগস্টের পর ‘যদু-মধু-কদু’ এসে আন্দোলনের নেতৃত্বে সর্বেসর্বা হয়ে গেছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার একসময় ইসলামী ছাত্রশিবিরের ‘সাথি’ ছিলেন—শিবিরের পক্ষ থেকে এমন তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর বৃহস্পতিবার রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এসব মন্তব্য করেন উমামা ফাতেমা।
পোস্টে উমামা ফাতেমা লেখেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্ক না থাকা অনেকেই ‘উড়ে এসে নেতা’ হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে সালাহউদ্দিন আম্মারকে তিনি অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করেন।
এর আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির সালাহউদ্দিন আম্মারের ‘সাথি’ পদ বাতিল করে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে সাংগঠনিক শৃঙ্খলাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়।
জুলাই আন্দোলনের সময়কার সমন্বয়ক কমিটি প্রসঙ্গে উমামা ফাতেমা বলেন, ‘সকল ছাত্র সংগঠনকে মাইনাস করে শিবির ও ছাত্রশক্তি কোরামের (গুপ্তশিবির) লোকজনকে সমন্বয়ক কমিটির অন্তর্ভুক্ত করা হয়।’ তাঁর ভাষ্য, এর কারণে ‘৫ আগস্টের পর যদু-মধু-কদু এসে সর্বেসর্বা হয়ে গেছে।
পোস্টে জুলাইয়ের আন্দোলনকে ‘ভাই-ব্রাদার কোরাম আর শিবিরের হাতে বন্দী’ করার অভিযোগও তোলেন তিনি। আন্দোলনের পর যারা দেশ ও রাজনীতিকে নিয়ে ‘ছেলেখেলা’ করছে, তাদের সমালোচনা করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাবেক এই সমন্বয়ক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়েও প্রশ্ন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন উমামা ফাতেমা। তাঁর দাবি, দেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে ফেসবুকের ‘ম্যানিপুলেশন’ যথেষ্ট। তাঁর ভাষায়, ‘পর্দার আড়ালের ইন্টারেস্ট গ্রুপ’ সময় সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুলাইয়ের নামে ‘ম্যানুফ্যাকচারড কনসেন্ট’ তৈরি করে।
তরুণদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তৈরি করা ‘হিরো’ বা জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, এমন অনেক ‘ম্যানুফ্যাকচারড ফিগার’ রয়েছে, যারা তরুণদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে বন্দী করার জন্য কাজ করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারের উদাহরণ হিসেবে মিয়ানমারের প্রসঙ্গও টেনে আনেন উমামা। রোহিঙ্গা গণহত্যার ক্ষেত্রে ফেসবুককে ‘অত্যন্ত এফিশিয়েন্ট টুল’ হিসেবে ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
‘আজকে একে, কালকে ওকে হিরো বানানো হচ্ছে’
জুলাই আন্দোলনের আগে মধ্যবিত্তের রাজনীতিবিমুখতা এবং আন্দোলনের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে হঠাৎ রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠার বিষয়টিও তুলে ধরেন উমামা ফাতেমা।
তিনি লেখেন, ‘মধ্যবিত্তের-I hate politics’ থেকে জুলাইয়ে হঠাৎ চোখ ফুটেছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ম্যানিপুলেট করে আজকে একে তো কালকে ওকে ‘হিরো’ বানানো হয়েছে।
জামায়াত-আওয়ামী লীগ নিয়েও মন্তব্য
পোস্টের শেষাংশে জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও মন্তব্য করেন সাবেক এই সমন্বয়ক। তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশের ইতিহাসের যাত্রাপথ এখন জামায়াতের কারণে ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, জামায়াত আর আওয়ামী লীগে কোনো পার্থক্য নেই। জামায়াত নিজেদের ‘গণহত্যার কালিমা’ ঢাকতে দেশকে যেকোনো পর্যায়ে নিয়ে যেতে রাজি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
উমামা ফাতেমার এসব মন্তব্যের পর জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব, সমন্বয়ক কাঠামো, ছাত্ররাজনীতিতে বিভিন্ন সংগঠনের ভূমিকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
