জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আলোচিত সাবেক সদস্য ড. সহিদুল ইসলামের নামে-বেনামে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার সম্পদের অনুসন্ধান প্রকাশ্যে আসার পর দেশত্যাগের ঘটনায় যখন ব্যাপক আলোচনা চলছে, ঠিক সেই সময় সামনে এসেছে নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগ উঠেছে, সহিদুল ইসলামের আপন দুই ভাই শামীম আহমেদ ও সেলিম আহমেদের নামে-বেনামেও রয়েছে কয়েক শত কোটি টাকার সম্পদ। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) নতুন করে অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অনুসন্ধানী সূত্রের দাবি, সহিদুল ইসলাম দেশ ছাড়ার পর তার রেখে যাওয়া ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিভিন্ন সম্পদের দেখভালের দায়িত্ব পালন করছেন তার ভাই সেলিম আহমেদ। অন্যদিকে শামীম আহমেদ রয়েছেন ইউনিক পলি ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক হিসেবে। এছাড়া তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে আইডিয়াল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, যার আনুমানিক বাজারমূল্য কয়েক শত কোটি টাকা বলে অভিযোগ রয়েছে।
শুধু শিল্পকারখানাই নয়, সেলিম এন্টারপ্রাইজ নামে একটি সি অ্যান্ড এফ (C&F) লাইসেন্স (লাইসেন্স নং-২৬৬৮, ইস্যু: ১৭-১০-২০০৮) পরিচালনার তথ্যও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ব্যবসার আড়ালে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে, যার প্রকৃত উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এ ব্যবসার সকল জামানত সহিদুলের,এমন তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
৫৩ ফ্ল্যাট থেকে হাজার হাজার শতাংশ জমি—সম্পদের বিশাল সাম্রাজ্য
একটি অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম -এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ড. সহিদুল ইসলাম, তার স্ত্রী ফাহমিদা রাখী, ছেলে ফারহান ইসলাম এবং ঘনিষ্ঠ স্বজনদের নামে-বেনামে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে—
. রাজধানী ঢাকায় ৫৩টি ফ্ল্যাট
. পূর্বাচলে ৬টি প্লট, আনুমানিক মূল্য ৬২ কোটি টাকা
. বসুন্ধরা আবাসিকে শতকোটি টাকার ভবন
. নিউমার্কেট ও আজিজ সুপার মার্কেটে একাধিক বাণিজ্যিক দোকান
. মধুমতি মডেল টাউনে প্রায় ১০ কোটি টাকার বাংলো
. শেয়ারবাজারে প্রায় ৮০ কোটি টাকার বিনিয়োগ
. বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ
এছাড়া নিজ জেলা বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে বাবার নামে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি কলেজ, ৫ হাজারের বেশি শতাংশ জমি এবং খুলনা শহরে বহুতল ভবনের তথ্যও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
বক্তব্য চাওয়ার পরই দেশত্যাগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের আগে ২৩ মে সহিদুল ইসলামের বক্তব্য নিতে তার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসায় যান প্রতিবেদক। তবে নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী নন।
এর মাত্র দুই দিন পর, ২৫ মে, তিনি থাই এয়ারওয়েজের TG-322 ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ব্যাংককের উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তিনি মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
পরিবারকেও বিদেশে পাঠানোর অভিযোগ
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সম্ভাব্য আইনি জটিলতার আশঙ্কায় সহিদুল ইসলাম তার স্ত্রী ফাহমিদা রাখী এবং ছেলে ফারহান ইসলামকেও পরবর্তীতে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাত মাসে চারবার বিদেশ সফর
ট্রাভেল রেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত সাত মাসে একই পাসপোর্ট ব্যবহার করে তিনি চারবার বিদেশ সফর করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—
. ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব সফর
. নেপাল সফর এবং ভারত হয়ে দেশে ফেরা
. মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড সফর
. সর্বশেষ ২৫ মে ব্যাংকক হয়ে বিদেশ গমন
দুদক ও এনবিআরের প্রাথমিক অনুসন্ধান
প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অভিযোগ সামনে আসার পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) সহিদুল ইসলামের সম্পদের উৎস, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে নতুন করে তার দুই ভাই শামীম আহমেদ ও সেলিম আহমেদের নামে উঠে আসা সম্পদের অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে পুরো বিষয়টির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। তবে একটি সূত্রের দাবি,চিটাগাং একাধিক বাড়ি ফ্ল্যাট রয়েছে। সিএন্ডএফ ব্যবসায় কয়েক’শ কোটি টাকা সহিদুলের জামানত সেলিমের হেফাজতে রক্ষিত। এগুলো জব্দ করার দাবি জোরালো হচ্ছে।
উল্লেখ্য, উপরের তথ্যগুলো বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও উত্থাপিত অভিযোগের ভিত্তিতে উপস্থাপিত। সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা সত্যতা এখনো যথাযথ তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়নি।
উল্লেখ্য যে, দুদকের অভিযোগসহ বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে।
