অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়েই হার মানে দারিদ্র্য—মে দিবসে পটিয়ায় শ্রমিকদের বুকভরা আর্তনাদের ছায়া।
“দিনে ৫০০ টাকা আয় করি, কিন্তু বিচার চাইতে গেলে লাগে ১২০০ টাকা—তাহলে আমরা কোথায় যাব?—এই একটিমাত্র প্রশ্নেই যেন জমাট বেঁধে আছে হাজারো শ্রমিকের নীরব কান্না, অপমান আর বঞ্চনার দীর্ঘ ইতিহাস।
চট্টগ্রামের পটিয়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বিকেলটা যেন শুধুই একটি সভা ছিল না—ছিল শ্রমজীবী মানুষের বুকফাটা আর্তনাদের মঞ্চ। মহান মে দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সেই আলোচনা সভায় নিজের জীবনের কষ্টগাঁথা তুলে ধরে দর্জি শ্রমিক ও শারীরিকভাবে কর্মক্ষম মিজানুর রহমান যেন হয়ে উঠেছিলেন সব শ্রমিকের কণ্ঠস্বর।
কাঁপা গলায় তিনি বলেন, থানায় অভিযোগ লিখতেই লাগে ৩০০ টাকা, জমা দিতে আরও ৩০০, আইনি সহায়তায় ৬০০—সব মিলিয়ে ১২০০ টাকা। অথচ আমার সারাদিনের আয় মাত্র ৫০০ টাকা। বিচার চাইব কীভাবে? ন্যায়বিচার কি শুধু টাকার মানুষের জন্য?
তার এই প্রশ্নে মুহূর্তেই নীরব হয়ে যায় চারপাশ। যেন আকাশ-বাতাসও ভারী হয়ে ওঠে অব্যক্ত বেদনায়।
মিজানুর আরও বলেন, আমরা শুধু কম মজুরির বিরুদ্ধে লড়াই করি না, ন্যায্য অধিকার পেতেও প্রতিটি ধাপে বাধা। টাকা না থাকলে ন্যায়বিচারও যেন আমাদের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
তার কণ্ঠে ছিল না কোনো নাটকীয়তা, ছিল কেবল নির্মম বাস্তবতার সরল স্বীকারোক্তি—যেখানে অন্যায়ের শিকার হয়েও অসহায় শ্রমিকরা মুখ বুজে সহ্য করে যায়, কারণ বিচার চাইতে গেলেই তাদের ভাঙতে হয় অর্থের পাহাড়।
সভায় উপস্থিত বক্তারাও একই সুরে কথা বলেন। তারা জানান, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা ও সহজলভ্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর বাস্তবায়নই পারে শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্য বদলাতে।
সভা শেষে লাল পতাকার মিছিল শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। সেই মিছিল শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না—ছিল প্রতিবাদের রঙে রাঙানো আশা, ছিল ন্যায়ের স্বপ্নে ভেজা এক নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা।
তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—
এই লাল পতাকার ঢেউ কি পৌঁছাবে ক্ষমতার দরজায়?
নাকি ৫০০ টাকার জীবনে ১২০০ টাকার বিচার চিরকালই থেকে যাবে এক অসম্ভব স্বপ্ন হয়ে? এখন শ্রমিকদের ভাবনার বিষয় একটাই, শ্রমিকের দাবি বাস্তবায়ন হবে? না কি আইনের মারপ্যাঁচে ফাইল বন্দী হয়ে থাকবে।
