এক নেত্রীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা, আদালতের আদেশে নতুন করে গ্রেপ্তার; অন্য নেত্রীকে ঘিরে আটকের গুঞ্জন, কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতা, বৈষম্যমূলক ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন। ফাইল ছবি
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের করা একের পর এক মামলায় আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি খাদিজা আক্তার উর্মি। কারাগারে থাকা এই নেত্রীকে এবার ধানমন্ডিতে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা এবং গুলি চালানোর ঘটনায় দায়ের করা আরেকটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছেন আদালত।
অন্যদিকে, যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক আকলিমা আক্তার এষাকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আটকের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লেও এখন পর্যন্ত তাঁর গ্রেপ্তার বা আটকের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ও গ্রেপ্তার নিয়ে আলোচনা প্রকাশিত হওয়ার পরও তিনি কীভাবে গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলছেন, তা নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
একদিকে উর্মির বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় ধারাবাহিক আইনি পদক্ষেপ, অন্যদিকে এষাকে ঘিরে অনিশ্চয়তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীরবতা—দুই নেত্রীর ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকার এই ভিন্নতা নিয়ে রাজনৈতিক ও সচেতন মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য রয়েছে কি না, কিংবা কারও ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো প্রভাব কাজ করছে কি না।
নতুন মামলায় উর্মিকে গ্রেপ্তার দেখালেন আদালত
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা এবং গুলি চালানোর ঘটনায় দায়ের করা হত্যাচেষ্টা মামলায় খাদিজা আক্তার উর্মিকে ফের গ্রেপ্তার (শ্যোন অ্যারেস্ট) দেখানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
আদালত কর্তৃক উর্মিকে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট সাদিয়া আক্তার সেতু।
আদালত সূত্র জানায়, ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের ২৪ নম্বর এজলাসে শুনানি শেষে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনায়েদ ধানমন্ডি মডেল থানার মামলায় উর্মিকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন। এর আগে সিএমএম আদালতের ১০ নম্বর এজলাসে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা শাহবাগ থানার মামলার কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
আসামিপক্ষে শুনানিতে অংশ নেওয়া সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাদিয়া আক্তার সেতু জানান, ধানমন্ডি থানার হত্যাচেষ্টা মামলায় পুলিশ খাদিজা আক্তার উর্মিকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেছিল। শুনানি শেষে আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে তাঁকে এ মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর আদেশ দিয়েছেন।
আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলির অভিযোগ
আদালতে জমা দেওয়া পুলিশের আবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে ধানমন্ডি ৩ নম্বর সড়কে ল্যাবএইড হাসপাতালের বিপরীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলছিল। ওই সময় আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে আগ্নেয়াস্ত্র, হাতবোমা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে মো. সজিব ইসলাম (৩২) নামের এক যুবক পিঠে ও কোমরে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন।
এ ঘটনায় ধানমন্ডি মডেল থানায় দণ্ডবিধি ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটির নম্বর ১০, তারিখ ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ধানমন্ডি মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. তারিকুল ইসলাম আদালতে দেওয়া আবেদনে উল্লেখ করেন, তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ঘটনার সঙ্গে খাদিজা আক্তার উর্মির প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি আগে থেকেই অন্য একটি মামলায় কারাগারে থাকায় তদন্তের স্বার্থে তাঁকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগে শাহবাগ থানায় দায়ের করা মামলায় এর আগে গ্রেপ্তার হন খাদিজা আক্তার উর্মি। সেই থেকে কারাগারে থাকা এই ছাত্রলীগ নেত্রীকে এবার ধানমন্ডি থানার নতুন মামলায়ও গ্রেপ্তার দেখানো হলো।
এষাকে ঘিরে আটকের গুঞ্জন, আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা নেই
অন্যদিকে, যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক আকলিমা আক্তার এষাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করেছে—এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার সন্ধ্যা থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো দায়িত্বশীল সূত্র তাঁর আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
প্রবল গণআন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মন্ত্রিসভার সদস্য থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান। তাঁদের মধ্যে আকলিমা আক্তার এষাও ছিলেন বলে জানা যায়। এরই মধ্যে হঠাৎ তাঁকে আটকের খবর ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
একটি অনির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে দাবি করা হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এষাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। তবে এ দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য বা আনুষ্ঠানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও তাঁর আটকের বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য মেলেনি।
ফলে এষাকে আটকের খবরটি এখনো নিশ্চিত নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক সূত্রে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
কে এই আকলিমা আক্তার এষা?
আকলিমা আক্তার এষা যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে তিনি নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
তাঁকে ঘিরে আটকের গুঞ্জন, বিভিন্ন অভিযোগ এবং গ্রেপ্তার না হওয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আইন প্রয়োগে ভিন্নতা কেন, জনমনে প্রশ্ন
খাদিজা আক্তার উর্মির বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় ধারাবাহিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলেও আকলিমা আক্তার এষাকে ঘিরে আটকের গুঞ্জন ও নানা আলোচনা সত্ত্বেও তাঁর বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবস্থান স্পষ্ট নয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এষাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পরও তাঁকে গ্রেপ্তার না করার কারণ কী, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
কেউ কেউ এ পরিস্থিতির পেছনে প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ কিংবা অদৃশ্য কোনো শক্তির ভূমিকা রয়েছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করছেন। যদিও এমন অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আইন সবার জন্য সমান—রাষ্ট্রের এই মৌলিক নীতির বাস্তব প্রয়োগ নিয়েই এখন জনমনে প্রশ্ন। কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকবেন, আবার কেউ একই ধরনের অভিযোগে দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হবেন—এমন ধারণা তৈরি হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এষাকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত আনুষ্ঠানিক অবস্থান পরিষ্কার করা। একই সঙ্গে উর্মি ও এষাসহ সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত পদক্ষেপ নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগই পারে জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্ন ও অস্বস্তি দূর করতে।
সাম্প্রতিক রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক অসন্তোষ ও সহিংসতার ঘটনায় যুব মহিলালীগ নেত্রী আকলিমা আক্তার এষার ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে।
