মাসুদ, তুমি ভালো হয়ে যাও—বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে বহুল আলোচিত এই মন্তব্যটি আজও মানুষের মুখে মুখে। ২০১৭ সালের ১৮ জানুয়ারি তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) মিরপুর কার্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে তৎকালীন উপপরিচালক (প্রকৌশলী) মাসুদ আলমকে উদ্দেশ করে এই কথা বলেছিলেন।
সেই সময় বিআরটিএর মিরপুর কার্যালয় দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ছিল। প্রায় এক দশক পর আবারও আলোচনায় সেই মাসুদ আলম। একটি জাতীয় দৈনিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বর্তমানে চট্টগ্রাম বিআরটিএর বিভাগীয় পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মাসুদ আলমের কার্যালয়েও ঘুষ, দালালনির্ভর সেবা ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. মাসুদ তালুকদারের বিরুদ্ধে উঠেছে মাসোহারা আদায়, অনিয়ম, নিয়োগ-বাণিজ্য ও বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ। ফলে বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন পরিবহন খাতের এই দুই কর্মকর্তা—দুই ‘মাসুদ’।
চট্টগ্রাম বিআরটিএ: দালাল ছাড়া কি সেবা পাওয়া কঠিন?
চট্টগ্রাম বিআরটিএ কার্যালয়ে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, মূল কার্যালয়ের বাইরেই দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে একটি দালালচক্র—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। কার্যালয়ের পাশের মার্কেট ও উত্তর পাশের দোকানগুলোকে কেন্দ্র করে শতাধিক দালাল বিভিন্ন আবেদনপত্র প্রস্তুত করে সেবাপ্রার্থীদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে পাঠান বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ফিটনেস, ট্যাক্স টোকেন, ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির নিবন্ধন ও মালিকানা পরিবর্তনসহ বিভিন্ন সেবার জন্য অতিরিক্ত ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন আবদুস ছামাদ, ফোরকান-১, ফোরকান-২, মোহাম্মদ ইছা, খোরশেদ, এমরান, শহিদ, দিদার, মিনার, আক্তার ও রাজা।
এক সেবাপ্রার্থীর অভিযোগ, ক্যাজুয়াল স্টাফদের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের কাছে টাকা পৌঁছে দেওয়া হয়। দালালের মাধ্যমে দ্রুত কাজ হলেও সাধারণ মানুষকে দীর্ঘদিন হয়রানির শিকার হতে হয়।
ফটিকছড়ির বাসিন্দা মোহাম্মদ সাইমন জানান, আট মাস আগে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেও এখনো লাইসেন্স পাননি। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও বারবার তাকে সার্ভার সমস্যার অজুহাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মাসুদ আলমের বক্তব্য
এসব অভিযোগের বিষয়ে চট্টগ্রাম বিআরটিএর পরিচালক প্রকৌশলী মাসুদ আলম বলেন, তিনি প্রতিষ্ঠানকে ভালো করার চেষ্টা করছেন। তবে কার্যালয়ের বাইরে কেউ দালালি করলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তার দাবি, বাইরে টাকা লেনদেন হলেও জিজ্ঞাসাবাদের সময় অনেকেই তা স্বীকার করেন না।
তবে ভোক্তা অধিকার সংগঠনের নেতারা বলছেন, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে কার্যালয়ের সার্বিক পরিবেশ ও অনিয়মের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বিআরটিএ চট্টগ্রামের অনিয়ম ও ঘুষবাণিজ্যের দায় প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে মাসুদ আলমের ওপরই বর্তায়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, অনলাইন সেবার কথা বলা হলেও বাস্তবে এখনো মানুষকে বিআরটিএ কার্যালয়ে যেতে হয়, যা দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করছে।
বিআরটিসির মাসুদ তালুকদার: অভিযোগের দীর্ঘ তালিকা
রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের অন্যতম আলোচিত নাম প্রকৌশলী মো. মাসুদ তালুকদার, যিনি বর্তমানে ঢাকা ট্রাক ডিপোর ইউনিট প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি নতুন বাস ও ট্রাক থেকে যন্ত্রাংশ পরিবর্তন, ইঞ্জিন বিক্রি করে পুরোনো ইঞ্জিন স্থাপন, মবিল ও পোড়া মবিল বিক্রি, শ্রমিকদের বেতন কর্তন, ট্রিপ চুরি, তেল ও টায়ার চুরি, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি এবং নিয়োগ-বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, তার সম্পদের বড় অংশ স্ত্রী, শ্বশুর ও ছোট ভাইয়ের নামে রয়েছে। নারায়ণগঞ্জে বহুতল ভবন, ঢাকার বাসাবো, ওয়ারী ও খিলক্ষেতে স্ত্রীর নামে ফ্ল্যাট এবং পূর্বাচলের বিভিন্ন সেক্টরে প্লট থাকার অভিযোগও করা হয়েছে।
এ ছাড়া শেখ ফজলুল করীম সেলিম ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এপিএস-২ গাজি হাফিজুর রহমান লিকুর প্রভাব ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘদিন শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে মাসুদ তালুকদার এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন।
বিআরটিসিতে ‘মাসোহারা’ সিন্ডিকেটের অভিযোগ
বিআরটিসিকে ঘিরে আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—দেশের বিভিন্ন ডিপো ও ট্রেনিং সেন্টার থেকে নিয়মিত অবৈধ অর্থ আদায়ের একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২২টি ডিপো ও ট্রেনিং সেন্টার থেকে মাসে প্রায় ১ কোটি ৮৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত মাসোহারা আদায় করা হচ্ছে।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বিআরটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ মোল্লাকে ঘিরে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এতে পরিচালক (প্রশাসন ও অপারেশন্স) মো. রাহেনুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত ডিজিএম (ওয়ার্কস) মো. মনিরুজ্জামান মিয়া, মো. মফিজ উদ্দিন ও মো. নায়েব আলীর নামও অভিযোগে এসেছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ডিপো প্রধান পদে বসানোর ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেন হয়।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো থেকে ৩০ লাখ টাকা, ঢাকা ট্রাক ডিপো থেকে ২৫ লাখ টাকা, মতিঝিল ও রংপুর বাস ডিপো থেকে ১০ লাখ টাকা করে, জোয়ারসাহারা ডিপো থেকে ৮ লাখ টাকা এবং বরিশাল ডিপো থেকে প্রায় ৭ লাখ টাকা মাসিক আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে পদ?
বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ নথি ও অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, ১ কোটি ৮৩ লাখ টাকার অডিট আপত্তি থাকা সত্ত্বেও মোশাররফ হোসেন সিদ্দিককে ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে ঢাকা ট্রাক ডিপোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া হত্যা মামলার আসামি হওয়ার অভিযোগ থাকা এনামুল হককে ময়মনসিংহ ডিপোর দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
মাসুদ তালুকদারকে নিয়েও অভিযোগ রয়েছে, তার বিরুদ্ধে ১৭টি অভিযোগের মধ্যে ১২টি প্রমাণিত হওয়ায় একসময় তাকে বরখাস্তের আদেশ হয়েছিল। কিন্তু পরে শাস্তির পরিবর্তে তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তবে তিনি দাবি করেন, এসব অভিযোগ সঠিক নয় এবং অতীতে রাজনৈতিক চাপের কারণে তিনি স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারেননি।
তদন্তের মুখে বিআরটিসি
বিআরটিসির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ।
অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) ড. জিন্নাত রেহানা জানিয়েছেন, অনিয়মসংক্রান্ত অভিযোগগুলো তদন্তাধীন রয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা চলছে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য রাষ্ট্রীয় পরিবহন খাতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মকর্তা—বিআরটিএর মাসুদ আলম ও বিআরটিসির মাসুদ তালুকদার—দুজনকে ঘিরেই এখন নানা অভিযোগ ও আলোচনা। একজনকে একসময় প্রকাশ্যে বলা হয়েছিল “ভালো হয়ে যাও”, আরেকজনের বিরুদ্ধে উঠেছে মাসোহারা সিন্ডিকেট, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তৃত অভিযোগ।
অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হবে। তবে রাষ্ট্রীয় পরিবহন খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনসেবার মান নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত এখন সময়ের অন্যতম দাবি।
