প্রতীকী ছবি
মাদকের ভয়াল বিস্তার যেন শুধু ব্যক্তিজীবন নয়, ধ্বংস করে দিচ্ছে পুরো পরিবারকেও। দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে বাবা-মা হত্যার মতো নির্মম ঘটনা ঘটছে। আবার মাদক কেনার টাকা, কারবার ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হচ্ছে খুন, হামলা, ছিনতাইসহ নানা অপরাধ।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১ থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত এক মাসে মাদককে কেন্দ্র করে বা মাদকাসক্তদের হাতে অন্তত ১৩ জন খুন হয়েছেন। এ সময়ে হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছেন আরও পাঁচজন। একই সময়ে মাদকাসক্ত এক যুবক গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জুলাইয়ে নিহত ১৩ জনের মধ্যে মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন তিন বাবা ও দুই মা। অর্থাৎ নেশার আগুন শুধু সমাজে অপরাধ বাড়াচ্ছে না, আঘাত হানছে পরিবারের সবচেয়ে নিরাপদ সম্পর্কের জায়গাতেও।
মাদকের টাকা না পেয়ে বাবা-মাকে হত্যা
গত ৩০ জুলাই ফরিদপুরের বায়তুল আমান এলাকায় মাদক কেনার টাকা না পেয়ে মা সাহেলা বেগমকে হত্যা করে তাঁর ছেলে আব্দুর রহিম শেখ। জানা গেছে, প্রায় ১০ বছর আগে রহিম তার সৎমাকেও হত্যা করেছিল।
এর আগে ২৭ জুলাই সাভারের রাজফুলবাড়িয়ার ছাকিপাড়ায় মহিন মিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করে তাঁর কিশোর ছেলে। ২৫ জুলাই চট্টগ্রামের আনোয়ারায় মাদকাসক্ত ছেলে রিমন দাশগুপ্তের ছুরিকাঘাতে নিহত হন মা-বাবা দুজনই।
৩ জুলাই পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে মাদকাসক্ত ছেলে তাপস দেবনাথ শিলপাটা দিয়ে আঘাত করে ঘুমন্ত বাবা উত্তম দেবনাথকে হত্যা করে। আর মাদক কেনার টাকা না পেয়ে গত ১২ জুলাই রাতে গাজীপুরের শ্রীপুরে গার্মেন্টকর্মী স্ত্রী নাছিমা আক্তারকে কুপিয়ে হত্যা করে সাহেদুল ইসলাম।
মাদককে ঘিরে বাড়ছে খুনোখুনি
শুধু পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই নয়, মাদক কারবার ও বিরোধকে কেন্দ্র করেও একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে।
২২ জুলাই যশোর শহরের বারান্দীপাড়া ফুলতলা মোড়ে মাদক নিয়ে বিরোধের জেরে শরিফুলকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ১৬ জুলাই নোয়াখালীর কবিরহাটে মাদক নিয়ে পূর্বশত্রুতার জেরে মোহাম্মদ ফারুক নামে এক ব্যক্তি খুন হন।
এ ছাড়া ২১ জুলাই রাজধানীর হাজারীবাগ, ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ, ১৭ জুলাই কুষ্টিয়ার খোকসার দেবীনগর, ৪ জুলাই নারায়ণগঞ্জের বন্দর এবং ১ জুলাই চট্টগ্রামের পাঁচলাইশের মুরাদপুরে মাদককে কেন্দ্র করে একজন করে খুন হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
‘একজন মাদকসেবী, অশান্ত পুরো পরিবার’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আইনজীবী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মাদক শুধু একজন মানুষকে বিপথে নেয় না—তার প্রভাব গিয়ে পড়ে পুরো পরিবারের ওপর।
মাদকাসক্তদের একটি অংশ নেশার টাকা জোগাড় করতে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ধর্ষণসহ বিভিন্ন সহিংস অপরাধের তদন্তেও অনেক সময় মাদক সেবনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, কুশ, হেরোইন, গাঁজা ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক রাজধানী ও বড় শহরের গণ্ডি পেরিয়ে প্রত্যন্ত গ্রামেও পৌঁছে গেছে। ফলে মাদককে কেন্দ্র করে সামাজিক ও পারিবারিক কলহও দ্রুত বাড়ছে।
৮২ লাখ মানুষ মাদক ব্যবহার করছে
সম্প্রতি জাতীয় পর্যায়ের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো মাদক ব্যবহার করছে, যা মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। তাদের অধিকাংশই তরুণ।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে খুন, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগে সারাদেশে ১৮ হাজার ৮২০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে ৬ হাজার ৫৮০টি—মোট মামলার প্রায় ৩৫ শতাংশ।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২৯ জুলাই দেশের সব কারাগার মিলিয়ে বন্দি ছিলেন ৯৩ হাজার ৪৪০ জন। তাদের মধ্যে মাদকসংক্রান্ত মামলায় বন্দি ছিলেন ১৭ হাজার ৮১৯ জন, যা মোট বন্দির প্রায় ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষ ১৭ হাজার ২২৬ জন এবং নারী ৫৯৩ জন।
চিকিৎসার সুযোগ সীমিত, আসক্তের সংখ্যা বিপুল
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে মাত্র চারটি। বেসরকারি কেন্দ্র রয়েছে ৩৮৫টি।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে এসব নিরাময়কেন্দ্র থেকে ২১ হাজার আটজন মাদকাসক্ত চিকিৎসা নিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞের চোখে সংকট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, মাদকাসক্ত সন্তান কিংবা স্বামী পরিবারের সদস্যদের নির্যাতন ও মানসিক অশান্তির মধ্যে ফেলছে। এর ফলে পরিবারে সম্পর্কগত সংকট তৈরি হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তার মতে, মাদকের টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে মাদকাসক্তদের বড় একটি অংশ চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। মাদক নিয়ন্ত্রণে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে মাদকের প্রবেশ ও সহজলভ্যতা রোধ এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, মাদকবিরোধী অভিযানে অনেকে গ্রেপ্তার হলেও পরে জামিনে বেরিয়ে আবার একই কাজে জড়িয়ে পড়ছেন। তার মতে, মাদক কীভাবে দেশের বাইরে থেকে ঢুকছে, সীমান্তে কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং দেশের ভেতরে কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে—এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
চাঞ্চল্যকর ঐশী হত্যাকাণ্ডও ছিল মাদকের ছায়ায়
মাদকাসক্তির কারণে আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে ২০১৩ সালের আগস্টে রাজধানীর চামেলীবাগে পুলিশ দম্পতি হত্যার ঘটনাটি এখনও আলোচনায় রয়েছে। মাদকাসক্ত মেয়ে ঐশী রহমানের হাতে খুন হন পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না রহমান।
মা-বাবা হত্যার দায়ে বিচারিক আদালত প্রথমে ঐশীকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে উচ্চ আদালত সেই সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
‘আমার সাজানো সংসার তারা তছনছ করে দিয়েছে’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে দুই মাদকাসক্ত ছেলের নির্যাতনে অসহায় এক মায়ের জীবন যেন প্রতিদিনই আতঙ্কের মধ্যে কাটছিল। চার সন্তানের মধ্যে বড় ও মেজো ছেলে প্রায় সাত বছর ধরে ইয়াবায় আসক্ত। দুজনই কর্মহীন এবং একসঙ্গে মাদক সেবন করতেন।
মাদকের টাকা না পেলে ব্যবসায়ী বাবা ও সরকারি চাকরিজীবী মায়ের ওপর নির্যাতন চালাতেন তারা। এমনকি ঘরের আসবাবপত্র থেকে দরজা পর্যন্ত খুলে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দুই ছেলের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে দুই বছর আগে বাবা বাড়ি ছেড়ে চলে যান।
গত ৮ জুলাই দুই ছেলে মায়ের কাছে ১৩ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা ঘরের আসবাব ভাঙচুর করে এবং মাকে হত্যার হুমকি দেয়। শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে প্রতিবেশীদের সহায়তায় দুই ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দেন মা। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন।
গত ২৯ জুলাই ওই মা বলেন, দুই ছেলেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে অনেক চেষ্টা করেছেন তিনি। কিন্তু মাদকের কারণে তার সাজানো-গোছানো সংসার তছনছ হয়ে গেছে।
এদিকে ৩০ জুলাই জামালপুরের বকশীগঞ্জে মাদকাসক্ত ছেলে নাহিদ মিয়াকেও পুলিশের হাতে তুলে দেন তার বাবা। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন।
মাদকের কাছে হার মানছে সংসার
রাজধানীর হাজারীবাগে স্ত্রী ও শিশুসন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন রিকশাচালক মো. শাকিল। হেরোইনে আসক্ত হওয়ার পর রিকশা চালানো প্রায় ছেড়েই দেন তিনি। তিন মাসের বাড়িভাড়া বকেয়া হওয়ার পর একসময় নিরুদ্দেশ হয়ে যান।
অসহায় স্ত্রী ফারজানা আক্তার সাথী দেড় বছর বয়সী সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়ি মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজারে চলে যান। তিন মাসেও শাকিল স্ত্রীর কোনো খোঁজ নেননি। পরে গত ২৫ জুলাই ধানমন্ডির একটি পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
মাদকের টাকার জন্য বন্ধুকেও ছাড়েনি বন্ধুরা
মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে বন্ধুর জীবন কেড়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। গত ২৫ মার্চ মানিকগঞ্জের কালীগঙ্গা নদী থেকে অটোচালক রফিক মিয়ার মাথাবিহীন মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। আগের দিন অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকেই তিনি নিখোঁজ ছিলেন।
হত্যা মামলার তদন্তে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পুলিশের কাছে তারা স্বীকার করেন, মাদক কেনার টাকা না থাকায় বন্ধু রফিকের অটোরিকশা ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেছিলেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী রফিককে কালীগঙ্গা নদীর তীরে ডেকে নেওয়া হয়। বন্ধুত্বের আড়ালে যে মৃত্যুফাঁদ পাতা হয়েছিল, তা বুঝতেই পারেননি রফিক। সেখানে তাকে গলা কেটে হত্যা করে মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যান তারা।
মাদক এখন শুধু নেশা নয়—এটি পরিবারে অশান্তি, সহিংসতা ও প্রাণহানির এক ভয়ংকর কারণ হয়ে উঠছে। এক মাসের ১৩ হত্যাকাণ্ড সেই ভয়াবহ বাস্তবতারই নির্মম প্রতিচ্ছবি।
