সাবেক ডেপুটি কমিশনারের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ, সোনা চোরাচালান সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেওয়াসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ। ফাইল ছবি
ঢাকা কাস্টম হাউসের সাবেক ডেপুটি কমিশনার (বিচার) এবং বর্তমানে ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো (এনএসডব্লিউ) প্রকল্পের সহকারী প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কাস্টমস কর্মকর্তা সমরজিৎ দাসের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, সোনা চোরাচালান সিন্ডিকেটকে সহযোগিতা এবং অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি এসব অভিযোগ তুলে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগে সরকারি দায়িত্ব পালনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা নেওয়ার দাবি করা হয়েছে।
বিচার শাখায় ঘুষের ‘সিন্ডিকেট’?
অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকা কাস্টম হাউসের বিচার শাখায় দায়িত্ব পালনকালে সমরজিৎ দাসের বিরুদ্ধে যাত্রী হয়রানি, আটক পণ্য খালাসে অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ এবং দালালচক্রের মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগকারীর দাবি, বিচার শাখায় দায়িত্বে থাকার সময় সাধারণ যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করে অর্থ আদায়ের একটি প্রভাবশালী চক্র গড়ে ওঠে। বিভিন্ন মামলা নিষ্পত্তি এবং আটক পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে ফাইলপ্রতি কয়েক হাজার টাকা থেকে শুরু করে লাখ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায়ের অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, এসব অনৈতিকভাবে আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো। তবে কার কাছে, কীভাবে এবং কী পরিমাণ অর্থ পৌঁছানো হয়েছে—এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এই প্রতিবেদনের হাতে নেই।
সোনা চোরাচালানেও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
সমরজিৎ দাসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকেন্দ্রিক সোনা চোরাচালান সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ।
অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, বিমানবন্দরে সোনা চোরাচালানসংক্রান্ত কয়েকটি ঘটনায় তার নাম আলোচনায় আসে। বিচার শাখার দায়িত্বে থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে চোরাচালানকারীদের জব্দকৃত মালামাল খালাসে সহযোগিতা এবং মামলা ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম করার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি, জব্দ তালিকা, আলামত ব্যবস্থাপনার রেকর্ড, আদালতের আদেশ এবং দায়িত্ব পালনসংক্রান্ত নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারি চাকরির আয়ে ‘বিপুল সম্পদ’—উঠছে প্রশ্ন
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও সমরজিৎ দাসের নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে ওঠার তথ্য রয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, তার মালিকানাধীন বা সংশ্লিষ্ট ফ্ল্যাট, জমি এবং অন্যান্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করা হলে আয় ও সম্পদের মধ্যে অসামঞ্জস্যের তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
এ ছাড়া অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচারের অভিযোগও আনা হয়েছে। তবে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট নথি বা লেনদেনের তথ্য এই প্রতিবেদনে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ব্যাংক হিসাব ও আয়কর নথিতেই মিলতে পারে উত্তর
অভিযোগকারীর মতে, প্রকৃত চিত্র বের করতে সমরজিৎ দাসের আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, সম্পদ বিবরণী, দেশে-বিদেশে অর্থ লেনদেন এবং সম্পদ ক্রয়ের উৎস খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ঢাকা কাস্টম হাউসের বিচার শাখায় দায়িত্ব পালনকালে তার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলো, আটক ও খালাস হওয়া পণ্যের নথি এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলোর আর্থিক প্রভাবও পর্যালোচনা করার দাবি জানানো হয়েছে।
বিশেষ করে যেসব মামলায় আটক পণ্য দ্রুত খালাস বা জরিমানা কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, সেসব নথি যাচাই করলে অনিয়মের কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, তা স্পষ্ট হতে পারে।
দুদকের অনুসন্ধানেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র
সমরজিৎ দাসকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো বর্তমানে অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে; এগুলোর সত্যতা কোনো তদন্ত বা আদালতের রায়ে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে অভিযোগগুলো গুরুতর হওয়ায় তার সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক লেনদেন, আয়কর রিটার্ন, সম্পদ ক্রয়ের দলিল এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের তথ্য যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। পাশাপাশি কাস্টমসের বিচার শাখায় দায়িত্ব পালনকালে নেওয়া সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট ফাইলগুলোও তদন্তের আওতায় আনা হলে অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি কতটা, তা নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে।
বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রকাশ করা হবে
এসব অভিযোগের বিষয়ে কাস্টমস কর্মকর্তা সমরজিৎ দাসের বক্তব্য এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি/বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
তার বক্তব্য বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিষয়গুলো দুদকে দাখিল করা অভিযোগ ও অভিযোগকারীর দাবির ভিত্তিতে উপস্থাপিত। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি ও আর্থিক লেনদেনের স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
