দেড় বছরেও কথিত মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেই, ৫২ কেজি গাঁজা উদ্ধারে ২০ কেজি নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। এস আই কাইউম বাহাদুর। ফাইল ফটো
রাজধানীর মুগদা থানাধীন মানিকনগর পুলিশ ফাঁড়িকে ঘিরে মাদক ব্যবসা, জুয়ার আসর, আটক ব্যক্তিকে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া এবং অপরাধী চক্রের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কয়েকজন কথিত মাদক ব্যবসায়ী ও জুয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযোগের তীর দীর্ঘদিন ধরে ফাঁড়ির দায়িত্বে থাকা এসআই কাইম বাহাদুরের দিকেও। স্থানীয়দের দাবি, তার দায়িত্ব পালনকালে এলাকায় মাদক ও জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড বেড়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো কোনো স্বাধীন বা বিভাগীয় তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। ফলে অভিযোগগুলো যাচাই করতে প্রয়োজন নথিপত্র, মামলা ও জিডির রেকর্ড, জব্দ তালিকা, মালখানা রেজিস্টার, ভিডিও ফুটেজ, কল রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পরীক্ষা করা।
যাদের ঘিরে উঠেছে অভিযোগ
স্থানীয় পর্যায়ে কথিত মাদক ব্যবসা ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগে মিল্লাত, শরিফ, দেলা, নিঝু, রিনা, লতা, তুষার, কয়লা ও লতার মায়ের নাম উঠে এসেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, তুষার স্টুডিয়াম এলাকায়, কয়লা সবেদাতলা এলাকায়, লতার মা কুমিল্লা পট্টি এলাকায়, মিল্লাত মানিকনগর ডালে এলাকায়, দেলা চান্দা গলিতে, রিনা কমিশনার গলিতে, লতা বালুর মাঠ এলাকায় এবং নিঝু ওয়াসা রোড এলাকায় মাদক ব্যবসা বা সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে জড়িত।
এ ছাড়া দেলা ও লতার কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ‘চিনি বাবু’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে সাপ্তাহিক অর্থ সংগ্রহ করা হয়। তবে অর্থের পরিমাণ, সংগ্রহের উদ্দেশ্য এবং শেষ পর্যন্ত কার কাছে তা পৌঁছায়—এসব অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মাদক-জুয়ার কথিত স্পট, উঠছে অর্থ আদায়ের অভিযোগও
স্থানীয়দের ভাষ্য, মানিকনগর প্রেম গলি, চান্দা গলি, কমিশনার গলি, বালুর মাঠ, ওয়াসা রোড, সবেদাতলা, কুমিল্লা পট্টি ও মানিকনগর বিশ্বরোড এলাকায় মাদক ও জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড চলে।
একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে মান্ডা এলাকার কয়েকটি কথিত মাদক ও জুয়ার স্পট নিয়েও। স্থানীয়দের দাবি, এসব জায়গা থেকে নির্দিষ্ট হারে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয়।
তবে এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, মোবাইল ফোনের যোগাযোগের রেকর্ড এবং ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ যাচাই করা জরুরি।
‘দাতভাঙা সিরাজের’ মেসেজ, হাতে কথিত কল রেকর্ড
স্থানীয়ভাবে ‘দাতভাঙা সিরাজ’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তি দাবি করেছেন, ভোটের সময় ফাঁড়ির ইনচার্জকে টাকা দেওয়ার বিষয়ে তিনি মেসেজ করেছিলেন। এ সংক্রান্ত একটি কথিত কল রেকর্ড সাংবাদিকদের হাতে রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে রেকর্ডটির সত্যতা, কথোপকথনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পরিচয়, রেকর্ডটি কখন এবং কী প্রেক্ষাপটে করা হয়েছিল—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক যাচাই প্রয়োজন।
এদিকে সাংবাদিকদের হাতে আসা একটি ভিডিওতে কথিত জুয়ার আসরের সামনে সড়কে দাঁড়িয়ে টাকা নেওয়ার দৃশ্য রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ভিডিওটির ধারণের সময়, স্থান এবং দৃশ্যমান ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করা গেলে অভিযোগের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে।
আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ
ফাঁড়িতে বিভিন্ন সময়ে আটক ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ফাতেমাকে হিরনসহ আটকের ঘটনায় ৩০ হাজার টাকা, বিল্লালকে হিরনসহ আটকের ঘটনায় ২০ হাজার টাকা এবং লতার ভাইকে হিরনসহ আটকের ঘটনায় ১৯ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া একটি মোটরসাইকেল আটকের ঘটনায় ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট জিডি, মামলা, আটকের রেকর্ড, জব্দ তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারি মোটরসাইকেলের ৬০ লিটার অকটেন—হিসাব কোথায়?
ফাঁড়ির সরকারি মোটরসাইকেলের জন্য প্রতি মাসে ৬০ লিটার অকটেন বরাদ্দ থাকার অভিযোগও সামনে এসেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—বরাদ্দকৃত জ্বালানি পুরোপুরি ব্যবহার না হলে অব্যবহৃত জ্বালানির হিসাব কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়?
এ বিষয়ে মোটরসাইকেলের লগবুক, জ্বালানি গ্রহণের রেজিস্টার, বিল-ভাউচার এবং মাসিক ব্যবহার বিবরণী যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
২৫ কেজি তামা আত্মসাতের অভিযোগ
মানিকনগর বিশ্বরোডের একটি ভাঙারি দোকান ও পাম্পসংলগ্ন এলাকা থেকে প্রায় ২৫ কেজি তামা আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগকারী আলামিন বিষয়টি সামনে আনতে চাইলে তাকে মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো এবং মারধরের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এমনকি তাকে সাক্ষী হিসেবে হাজির না হওয়ার জন্যও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, জিডি বা মামলার নথি এবং কোনো বিভাগীয় তদন্ত হয়ে থাকলে তার নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
৫২ কেজি গাঁজা উদ্ধার, থানায় জমা ৩২ কেজি—বাকি ২০ কেজি কোথায়?
সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে মানিকনগর এলাকায় একটি প্রাইভেটকার থেকে গাঁজা উদ্ধারের ঘটনাকে ঘিরে।
অভিযোগকারীদের দাবি, অভিযানে মোট ৫২ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হলেও থানার মালখানায় ৩২ কেজি জমা দেখানো হয়েছে। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠছে—বাকি ২০ কেজি গাঁজার হিসাব কোথায়?
এ অভিযোগ সত্য কি না, তা নির্ধারণে জব্দ তালিকা, এজাহার, আলামত গ্রহণের রসিদ, মালখানা রেজিস্টার, মামলার নথি, আদালতে পাঠানো আলামতের পরিমাণ এবং অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশ সদস্যদের বক্তব্য একসঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
অভিযোগ রয়েছে, বাকি গাঁজা ছাড়িয়ে দেওয়ার নামে অর্থ আদায় করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগের সত্যতাও এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।
ইনচার্জের বক্তব্য ঘিরেও প্রশ্ন
এসআই কাইম বাহাদুরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে লেনদেনসংক্রান্ত বিষয়ে তিনি বক্তব্য দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
তার বক্তব্যের একটি রেকর্ড সাংবাদিকের কাছে পাঠানোর পর সেটি আবার মুছে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে মুঠোফোনে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
এ ছাড়া স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্যবহার করে সাংবাদিকদের ভয়ভীতি দেখানোর আশঙ্কার কথাও কেউ কেউ জানিয়েছেন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে বিষয়টি
অভিযোগগুলোর বিষয়ে মতিঝিল জোনের ডিসি মো. হারুন অর রশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বিষয়টি বিভাগীয়ভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
তদন্তেই মিলবে প্রকৃত সত্য
মানিকনগর ফাঁড়িকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো কতটা সত্য, আর কতটা ভিত্তিহীন—তা নির্ধারণে প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত।
বিশেষ করে ৫২ কেজি গাঁজা উদ্ধারের বিপরীতে ৩২ কেজি আলামত জমা দেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে বাকি ২০ কেজির হিসাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কথিত মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে পূর্বের মামলা, জিডি, গ্রেপ্তার ও অভিযানসংক্রান্ত তথ্য, জুয়ার স্পটের ভিডিও, কথিত কল রেকর্ড, অর্থ লেনদেনের তথ্য এবং সরকারি মোটরসাইকেলের জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে মানিকনগর ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই কাইম বাহাদুর, মুগদা থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবেদনে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
