দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা বলে বরখাস্ত, ১২ দিন পরই অভিযোগ প্রমাণিত নয়—একই সচিবের দুই চিঠিতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নাটকীয় ইউটার্ন। ফাইল ছবি
মাত্র ১২ দিন। আর এই ১২ দিনের ব্যবধানেই বদলে গেল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পুরো চিত্র। যে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তে অনিয়ম ও দুর্নীতির ‘প্রাথমিক সত্যতার প্রমাণ’ পাওয়ার কথা সরকারি নথিতে উল্লেখ করে বিভাগীয় মামলা ও সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, মাত্র ১২ দিন পর সেই কর্মকর্তাকেই বলা হলো—অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
ঘটনাটি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (DPHE) নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ তবিবুর রহমানকে ঘিরে। একই কর্মকর্তা, একই সচিবের স্বাক্ষরিত দুটি চিঠি—কিন্তু সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বিপরীত। ৯ এপ্রিলের চিঠিতে দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতার কথা, আর ২২ এপ্রিলের চিঠিতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ার ঘোষণা।
প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের এই আকস্মিক পরিবর্তন নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে—মাত্র ১২ দিনে কী এমন ঘটল, যার কারণে ‘প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত’ দুর্নীতির অভিযোগই শেষ পর্যন্ত আর প্রমাণিত রইল না?
৯ এপ্রিল: ‘প্রাথমিক সত্যতার প্রমাণ’, বিভাগীয় মামলা ও সাময়িক বরখাস্ত
নথি অনুযায়ী, ৯ এপ্রিল ২০২৬ স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মোঃ শহিদুল হাসান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে তবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে নেওয়া তদন্তের ফলাফল উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে বলা হয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্তে তবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
প্রাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
অর্থাৎ সরকারি নথির ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় পর্যন্ত অভিযোগগুলো এতটাই গুরুত্ববহ ছিল যে, বিভাগীয় মামলা এবং সাময়িক বরখাস্তের মতো কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করা হয়েছিল।
২২ এপ্রিল: ১২ দিন পরই বদলে গেল পুরো গল্প
কিন্তু ঘটনাপ্রবাহে নাটকীয় মোড় আসে মাত্র ১২ দিন পর।
২২ এপ্রিল ২০২৬, একই সচিব মোঃ শহিদুল হাসানের স্বাক্ষরিত আরেকটি চিঠিতে তবিবুর রহমানকে ঘিরে সম্পূর্ণ বিপরীত সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
সেখানে বলা হয়, তার বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভাগীয় মামলায় অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
এরপর তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়।
অর্থাৎ—
৯ এপ্রিল: তদন্তে দুর্নীতি ও অনিয়মের ‘প্রাথমিক সত্যতার প্রমাণ’ → বিভাগীয় মামলা → সাময়িক বরখাস্ত।
২২ এপ্রিল: অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি → মামলা থেকে অব্যাহতি → চাকরিতে পুনর্বহাল।
দুই সিদ্ধান্তের মাঝে সময় মাত্র ১২ দিন।
‘প্রমাণ’ গেল কোথায়?
এখন সামনে আসছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—৯ এপ্রিল যে প্রমাণের ভিত্তিতে বিভাগীয় মামলা ও সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, ১২ দিন পর সেই অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ার পেছনে কী প্রক্রিয়া কাজ করল?
অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি মর্মে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে কী ধরনের শুনানি হয়েছে? আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কীভাবে দেওয়া হয়েছে? তদন্তের কোন অংশ পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে? নতুন কোনো তথ্য বা নথি কি সামনে এসেছে? আগের তদন্তের কোনো অংশ কি বাতিল বা সংশোধন করা হয়েছে?
এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়া ৯ এপ্রিলের সিদ্ধান্ত থেকে ২২ এপ্রিলের সিদ্ধান্তে এমন দ্রুত পরিবর্তনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
একই সচিব, দুই চিঠি—দুই বিপরীত সিদ্ধান্ত
ঘটনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—দুটি চিঠিই একই সচিবের স্বাক্ষরিত।
৯ এপ্রিলের চিঠিতে তদন্তে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে বিভাগীয় মামলা ও সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত।
আর ২২ এপ্রিলের চিঠিতে বলা হলো, অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
একই কর্তৃপক্ষের নথিতে মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে এমন বিপরীত প্রশাসনিক অবস্থান এখন স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, প্রথম সিদ্ধান্তের পর এমন কী পরিবর্তন ঘটেছিল যে দ্বিতীয় সিদ্ধান্তে আগের অবস্থান পুরোপুরি পাল্টে গেল?
‘ক্লিন চিট’ নিয়ে নতুন আলোচনা
তবিবুর রহমানের পুনর্বহালকে শুধু চাকরিতে ফেরার ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ দ্বিতীয় চিঠির মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে আনা অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে প্রশাসনিক অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
ফলে ১২ দিনের ব্যবধানে একই কর্মকর্তাকে ঘিরে প্রশাসনিক নথিতে তৈরি হয়েছে দুই বিপরীত ছবি—
একদিকে দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতার প্রমাণ, অন্যদিকে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
এ কারণেই ঘটনাটি এখন সরকারি দপ্তরে আলোচনায় এসেছে—দুর্নীতির প্রমাণ’ থেকে মাত্র ১২ দিনে ‘ক্লিন চিট’!
নথিই এখন সবচেয়ে বড় সাক্ষী
পুরো ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে স্থানীয় সরকার বিভাগের গঠিত তদন্ত কমিটির মূল তদন্ত প্রতিবেদন, ৯ এপ্রিল ও ২২ এপ্রিলের মধ্যবর্তী নোটশিট, শুনানির নথি, আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্য, তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র এবং সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণ।
কারণ প্রথম চিঠিতে যে ‘প্রাথমিক সত্যতার প্রমাণ’ পাওয়ার কথা বলা হয়েছিল এবং দ্বিতীয় চিঠিতে যে কারণে অভিযোগ ‘প্রমাণিত হয়নি’ বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে—এই দুই অবস্থানের ভিত্তি পাশাপাশি পর্যালোচনা করলেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের আকস্মিক পরিবর্তনের প্রকৃত কারণ।
১২ দিনের এই ইউটার্নের জবাব কোথায়?
একটি সরকারি তদন্তে দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতার প্রমাণ পাওয়া গেল। তার ভিত্তিতে বিভাগীয় মামলা হলো, কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত হলেন।
তারপর মাত্র ১২ দিন পরই একই কর্তৃপক্ষ জানাল—অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
তাই এখন মূল প্রশ্ন একটাই—
৯ এপ্রিলের ‘প্রমাণ’ আর ২২ এপ্রিলের ‘অপ্রমাণ’—এই দুই সিদ্ধান্তের মাঝের ১২ দিনে আসলে কী ঘটেছিল?
প্রশ্নটির উত্তর লুকিয়ে থাকতে পারে সেই নোটশিট, তদন্ত-নথি ও সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়াতেই।
‘দুর্নীতির প্রমাণ’ থেকে ‘ক্লিন চিট’—মাত্র ১২ দিনের এই নাটকীয় প্রশাসনিক ইউটার্ন এখন স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্ত ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতার ওপরই বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে।
