রবিবার, ১২ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৮শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ক্ষুধা-তৃষ্ণার সঙ্গে মৃত্যুর লড়াই, বঙ্গোপসাগরে তিন দিন বয়া আঁকড়ে ভেসে বেঁচে ফিরলেন আল আমিন

অপূর্ব সরকার
জুলাই ১১, ২০২৬ ৮:৩৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া আল আমিন হাওলাদার (৪২) গলাচিপা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ছবি: সংগৃহীত

গভীর বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ, চারদিকে অথৈ পানি, মাথার ওপর খোলা আকাশ—নেই একফোঁটা খাবার, নেই পানির ব্যবস্থা। এমন মৃত্যুফাঁদে ছোট্ট একটি ফিশিং বয়া আঁকড়ে টানা তিন দিন ধরে জীবন-মৃত্যুর লড়াই চালিয়ে গেছেন পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার জেলে আল আমিন হাওলাদার (৪২)। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্লান্তি আর সঙ্গীদের একে একে হারিয়ে ফেলার অসহনীয় যন্ত্রণা সত্ত্বেও তিনি হার মানেননি। শেষ পর্যন্ত বুধবার সন্ধ্যায় ভোলার ঢালচর এলাকার কাছে স্থানীয় জেলেদের হাতে অলৌকিকভাবে উদ্ধার হন তিনি।

উদ্ধারের পর প্রথমে তাকে চরফ্যাশন হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে বৃহস্পতিবার রাতে স্বজনেরা তাকে গলাচিপা উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি করেন। আল আমিন উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের ইছাদি গ্রামের চান্দু হাওলাদারের ছেলে।

জীবিকার তাগিদে গত ৪ জুলাই আরও ১০ জন জেলেকে সঙ্গে নিয়ে ইলিশ শিকারের উদ্দেশ্যে গভীর সমুদ্রে যান আল আমিন। ঘটনার রাতে কুয়াকাটা উপকূলের পূর্ব-দক্ষিণে জাল ফেলছিলেন তারা। ঠিক তখনই হঠাৎ প্রবল ঝড়ের কবলে পড়ে মুহূর্তেই ডুবে যায় তাদের মাছ ধরার ট্রলার।

হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে আল আমিন বলেন, আমরা ১১ জন জেলে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরছিলাম। হঠাৎ ভয়াবহ ঝড় শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যে ট্রলারটি ডুবে যায়। আমি, ট্রলার মালিক এমাদুল সিকদারসহ আটজন বাইরে থাকায় কোনোভাবে বের হতে পারি। কিন্তু কেবিনে থাকায় ফোরকান হাওলাদার, তার ছেলে সায়েম হাওলাদার এবং পানপট্টি এলাকার এবাদুল হক বের হতে পারেননি।

তিনি জানান, উত্তাল ঢেউয়ের তাণ্ডবে এক সময় ট্রলার মালিক এমাদুল সিকদার, নাজমুল আলম, মোহাম্মদ বায়েজীদ, শাকিল আহমেদ ও রাকিব তাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। পরে তিনি, হারুন ও আকাশ ডুবে যাওয়া ট্রলারের একটি অংশ এবং একটি ফিশিং বয়া আঁকড়ে ভেসে থাকতে থাকেন।

আল আমিনের ভাষায়, দুই দিন পর ট্রলারের ভেতর থেকে ফোরকান ও এবাদুলের মরদেহ সাগরে ভেসে উঠতে দেখি। সেই দৃশ্য দেখে বুক ভেঙে কান্না আসে। পরে বুঝলাম, কান্না করলে চলবে না—বাঁচতে হলে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

এরপর আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। উত্তাল ঢেউয়ের তোড়ে হারুন ও আকাশও তার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। একা একটি ছোট্ট ফিশিং বয়া পেটের নিচে চেপে ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন তিনি।

আল আমিন বলেন, তিন দিন না খেয়ে, না পান করে সাগরে ভেসেছি। ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় চোখে অন্ধকার দেখেছি। শরীর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিল। তবুও আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছি। অবশেষে ভাসতে ভাসতে ভোলার ঢালচর এলাকায় পৌঁছে গেলে স্থানীয় জেলেরা আমাকে উদ্ধার করেন।

গজালিয়ার সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, বুধবার বিকেল ৩টার দিকে ভোলার শশীভূষণ থানা থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরের ঢালচর এলাকায় আল আমিনকে উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন এবং শারীরিকভাবে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন।

গলাচিপা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুন্নবী বলেন, আল আমিনের শরীর অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তাকে হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছে।

তিনি আরও জানান, ট্রলারে থাকা ১১ জেলের মধ্যে এখন পর্যন্ত ছয়জন জীবিত উদ্ধার হয়েছেন। পাঁচজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের সন্ধানে কোস্ট গার্ড ও নৌপুলিশের উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে প্রাথমিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন, নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ও নিখোঁজ জেলেদের পরিবারের পাশে প্রশাসন সার্বক্ষণিক রয়েছে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।