বিশেষ অনুসন্ধান | পর্ব–১। ছবি : সংগৃহীত
শেরেবাংলা নগর-২ নম্বর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলামকে ঘিরে উঠেছে ব্যাপক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজার ও জিয়া উদ্যানসহ বিভাগের বিভিন্ন উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পে এলটিএম, ওটিএম ও আরএফকিউ পদ্ধতির অপব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, বিসিএস ৩২তম ব্যাচের এই প্রকৌশলী অতীতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে একই ধরনের বিতর্কে জড়িয়েছিলেন। মতিঝিল বিভাগে এসডিই হিসেবে এজিবি কলোনির হাইরাইজ ভবন নির্মাণ প্রকল্পে ভ্যারিয়েশন ও অন্যান্য কাজের মাধ্যমে প্রায় ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
শহীদ জিয়ার মাজার এলাকায়ও অনিয়মের অভিযোগ
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজার ও জিয়া উদ্যানের রক্ষণাবেক্ষণ কাজকে কেন্দ্র করে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে একই ধরনের কাজ একাধিক আরএফকিউ, এলটিএম ও ওটিএমে বিভক্ত করে বরাদ্দ দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। বাস্তবে অধিকাংশ কাজ হয়নি বা নামমাত্র কাজ করে পূর্ণ বিল নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, জিয়া উদ্যান, ক্রিসেন্ট লেক, মেমোরিয়াল হল, গাইডওয়াল, ইটের পথ, টয়লেট, ড্রেন, লেক পরিষ্কার, গ্রিল, ব্যারিকেড, স্যানিটারি মেরামত, আবর্জনা অপসারণ, পানি নিষ্কাশন, গ্যারেজ ও ব্যারাক সংস্কারসহ অর্ধশতাধিক আরএফকিউর মাধ্যমে একই ধরনের কাজ দেখিয়ে সরকারি অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে।
পিপিআর–২০২৫ লঙ্ঘনের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পিপিআর–২০২৫ এর ৯২(৬) ধারা অনুযায়ী কোটেশন আহ্বানের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে পছন্দের ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে ‘ম্যাপিং’ প্রক্রিয়ায় কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রতিযোগিতা ব্যাহত হয়েছে এবং সরকার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, কোটেশন আহ্বান, মূল্যায়ন, কাজের বাস্তবায়ন ও বিল পরিশোধ—সব ক্ষেত্রেই পিপিআর–২০২৫-এর একাধিক বিধান উপেক্ষা করা হয়েছে।
আরএফকিউর আড়ালে শতাধিক কাজ
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, টেন্ডার আইডি ১৩০০১৫৫৫৫, ১৩০১৬২৩, ১৩০০৯০২, ১৩০০৯০৮, ১৩০০৯৬১, ১৩০১৬২৫, ১৩০১৭৫২, ১৩০১৭৫৯, ১৩০১৫৭৫, ১৩০১৮১৩, ১৩০১৮১৪, ১২৯৯২০১, ১২৯৮৯৮৬, ১২৯৯১৯১, ১২৯৯২৪৬, ১২৯৯৯১৩, ১২৯৯২৬১, ১২৯৯১৮১, ১২৯৯৬২২, ১২৯৯২৪৯, ১২৯৯২০৬, ১২৯৯৬৩১, ১২৯৯৬৯৮, ১২৯৯৭০০, ১২৯৯৬৯৬, ১২৯৯৭০৮, ১২৭২৪৭৫, ১২৪৪৩০৭৭, ১২৪৪৩৯৯, ১২৪৪৩৩৯, ১২৪৪৩১৪, ১২৪৪৪২৫-সহ অসংখ্য আরএফকিউর মাধ্যমে জিয়া উদ্যান, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পিজিআর ব্যারাক, আবাসিক এলাকা ও অন্যান্য স্থাপনায় রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার কাজ দেখানো হয়েছে।
একই কাজের জন্য দ্বৈত বিলের অভিযোগ
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ওটিএম টেন্ডার আইডি ১২৬১৫৫০-এর মাধ্যমে ২০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দিয়ে জিয়া উদ্যানের দৈনন্দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হলেও, একই ধরনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ আবার একাধিক আরএফকিউর মাধ্যমে দেখিয়ে অতিরিক্ত বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাঠ কর্মকর্তার দাবি, একই ধরনের কাজ ৪ থেকে ৭টি আলাদা আরএফকিউতে ভাগ করে ভুয়া বিলের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
ওটিএমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার অভিযোগ
২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে ওটিএম পদ্ধতিতে বিপুল সংখ্যক টেন্ডার পছন্দের ঠিকাদারদের দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট টেন্ডার আইডির মধ্যে রয়েছে—
১২৯৫১৫৮, ১২৮০১২৮, ১২৭৩৯২২, ১২৮৩৪২৮, ১২৭৫৫২০২, ১২৭৫২৫৫৭, ১২৬৬৩১৫, ১২৭৫৭২৬, ১২৩৮৭০৩, ১২৩৮৪০৮, ১২২৩৯৫৯, ১২২১৫০৭, ১১৫৬৮২৫, ১১২৪১২৬, ১১৫৭১০০, ১১৫৬৮১৭, ১১৩১৮৮৯, ১১৫৭০৫৬, ১১৫৮০৭২, ১২২৪০২০, ১২২৪৩৮১, ১২২২৬৪৪, ১২২৩৯৩৩, ১২২৩৯৯৬, ১২৪৫৮০০, ১২৪৫৭৫৩, ১২৪৫৫৫৭, ১২৪৫৫১২, ১২৬৬১৯০, ১২৬৬২৪৩, ১২৬৬২৫০, ১২৬৬১০৬, ১২৬৭০৮৪, ১২৭৯৮০৬, ১২৭৯৮০৭, ১২৭৫২৭৩, ১২৭৫২৬৫ ও ১২৬১৫৫০।
আগের কর্মস্থলেও বিতর্ক
সূত্রের দাবি, মতিঝিল বিভাগে এজিবি কলোনি প্রকল্পে ভ্যারিয়েশন কাজের মাধ্যমে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। পরে পিরোজপুরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবেও অল্প সময়ে নানা বিতর্কের জন্ম দেন তিনি।
বর্তমানে শেরেবাংলা নগর-২ বিভাগে যোগদানের পরও একই ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জিয়া উদ্যানে প্রায় ৬ কোটি টাকার বরাদ্দের বড় অংশ নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
মন্তব্য মেলেনি
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলামের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য, এর আগেও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রকাশ্যে তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে নীরবতার আড়ালে কোনো অদৃশ্য শক্তির উত্থান নাকি দোষ স্বীকার? নীরবতা মানে কি দায়মুক্তির ইঙ্গিত।এ নিয়ে বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। দুদকের নীরবতা ও প্রশ্নবিদ্ধ।
(চলবে… পরবর্তী পর্বে থাকছে—কোন কোন ঠিকাদারের মাধ্যমে কীভাবে গড়ে ওঠে কথিত সিন্ডিকেট, কারা ছিলেন সুবিধাভোগী এবং নথিপত্রে কী কী অসঙ্গতি মিলেছে।) অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।
