মঙ্গলবার, ৭ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

৮০ কোটি টাকার বিআইডব্লিউটিএ টেন্ডার ঘিরে তোলপাড়, মায়ার-কবিরস সিন্ডিকেট’কে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই ৬, ২০২৬ ১:০১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন চাঁদপুর যাত্রী টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের প্রায় ৮০ কোটি টাকার একটি টেন্ডার ঘিরে অনিয়ম, পূর্বনির্ধারিত মূল্যায়ন, সরকারি অর্থের সম্ভাব্য অপচয় এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী কুমিল্লা ডকইয়ার্ড বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া এক লিখিত অভিযোগে দাবি করেছে, প্রকৃত মূল্যায়ন ছাড়াই মাত্র এক কার্যদিবসের মধ্যে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে এবং সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে অধিক দরদাতাকে কাজ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, টেন্ডার নং ১২৯৪৯৯৩ (BRWTP-W3-LOT-02A)-এর দরপত্র ২৫ জুন ২০২৬ বিকেল ৪টায় খোলা হয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পরদিনই কার্যাদেশ চূড়ান্ত করা হয়। অথচ ৮০ কোটির বেশি মূল্যের একটি অবকাঠামো প্রকল্পে প্রশাসনিক, কারিগরি, আর্থিক মূল্যায়ন, যোগ্যতা যাচাই ও অনুমোদন সম্পন্ন করতে সাধারণত দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে।

অভিযোগকারী যৌথ উদ্যোগের দাবি, এত অল্প সময়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন বাস্তবে সম্ভব নয়। তাদের ভাষায়, কার্যাদেশের সিদ্ধান্ত আগেই নির্ধারিত ছিল এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ছিল শুধুই আনুষ্ঠানিকতা।

সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে বেশি দরদাতাকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ

টেন্ডার ওপেনিং রিপোর্টের তথ্য উল্লেখ করে অভিযোগে বলা হয়েছে, টিবিইএএল-টিসিএসবিএল-টিইসি যৌথ উদ্যোগের মূল্যায়িত দর ছিল ৭৬ কোটি ২৩ লাখ ৫৬ হাজার ১১ টাকা, অন্যদিকে মায়ার-কবিরস যৌথ উদ্যোগের মূল্যায়িত দর ছিল ৮০ কোটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা বেশি দর থাকা সত্ত্বেও তাদের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।

অভিযোগকারীদের মতে, সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী কারিগরি দিক থেকে যোগ্য সর্বনিম্ন দরদাতাকেই কার্যাদেশ দেওয়ার কথা। সেই নীতি অনুসরণ করা হলে সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থের উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় সম্ভব হতো।

অতীত রেকর্ড নিয়েও প্রশ্ন

চিঠিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের অতীত প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিআইডব্লিউটিএর একাধিক প্রকল্পে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটিকে বারবার সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপরও একই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বাধীন যৌথ উদ্যোগকে আবারও বড় প্রকল্প দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রভাব ও মালিকানা নিয়ে অভিযোগ

অভিযোগপত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বার্থের সংঘাতের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপনের পারিবারিক ও ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, যা টেন্ডার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে বলে অভিযোগ।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মারিয়াম জামান নামমাত্র চেয়ারম্যান হলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রিপনের হাতে। অভিযোগকারীদের দাবি, বর্তমানে ভারতে অবস্থান করেও রিপন নিজের কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করছেন।

পাঁচ দফা দাবি

অভিযোগকারী যৌথ উদ্যোগ বিআইডব্লিউটিএর কাছে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে। সেগুলো হলো—

কার্যাদেশ অবিলম্বে স্থগিত করা।

পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ।

স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন।

সরকারি বিধি অনুযায়ী পুনর্মূল্যায়ন।

অভিযোগ উত্থাপনের কারণে কোনো প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার নিশ্চয়তা।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হওয়ায় অভিযোগপত্রের অনুলিপি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিশ্বব্যাংক, সিপিটিইউ, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালকের ব্যাখ্যা

অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক কর্ণেল ফেরদৌস বলেন, প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল ২৯ জুন পর্যন্ত। ওই সময়ের মধ্যে প্রকিউরমেন্ট সম্পন্ন না হলে প্রকল্পটি নতুন প্রকল্পের আওতায় চলে যেত এবং বিশ্বব্যাংকের নতুন প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইন অনুযায়ী পুরো প্রক্রিয়া আরও ৬ থেকে ৮ মাস পিছিয়ে যেত।

তিনি জানান, চাঁদপুর যাত্রী টার্মিনাল প্রকল্পটি প্রায় ১০ বছরের পুরোনো। আগের ঠিকাদার তমা কনস্ট্রাকশন কাজ অসমাপ্ত রেখে চলে যাওয়ায় এবার তৃতীয়বারের মতো টেন্ডার আহ্বান করা হয়। হাতে সময় কম থাকায় জনগণের স্বার্থে ১৪ দিনের বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দ্রুত টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

তিনি আরও বলেন, ২৫ জুন ই-জিপি সিস্টেমে টেন্ডার খোলার পর মূল্যায়নে দেখা যায় সর্বনিম্ন দরদাতা কোম্পানি ভুয়া অডিট রিপোর্ট ও কাগজপত্র জমা দিয়েছে। ফলে তারা টেকনিক্যালি নন-রেসপন্সিভ হিসেবে অযোগ্য বিবেচিত হয়। ২৯ জুনের নির্ধারিত সময়সীমা রক্ষার জন্য একদিনের মধ্যে মূল্যায়ন শেষ করে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে বিশ্বব্যাংকে পাঠানো হয়।

তার দাবি, ই-জিপি সিস্টেমে রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানোর সুযোগ নেই। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাণিতিক হিসাব ও জমাকৃত দলিলের ভিত্তিতে কাজ করে। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজন হলে ভুয়া কাগজপত্র দাখিলকারী প্রতিষ্ঠানকে ব্ল্যাকলিস্ট করা হতে পারে।

মায়ার-কবিরস সিন্ডিকেট নিয়ে নতুন অভিযোগ

বিস্তারিত অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠে এসেছে যে, মায়ার লিমিটেড মাত্র দুই মাস আগেও একই টেন্ডারে প্রয়োজনীয় টার্নওভার না থাকায় ‘নন-রেসপন্সিভ’ ঘোষণা হয়েছিল। কিন্তু পরে শর্ত শিথিল করে তাদের আবার প্রতিযোগিতায় ফিরিয়ে আনা হয় বলে অভিযোগ।

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, আগের ৭৩ কোটি টাকার টেন্ডার পুনরায় ডেকে প্রায় ৭৭ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়, যাতে প্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে সুবিধা পায়।

প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন

ঠিকাদারদের একাংশের দাবি, টাকা ফেরত যাওয়ার অজুহাতে তড়িঘড়ি করে টেন্ডার সম্পন্ন করা হয়েছে। অথচ প্রকল্পটি আগে থেকেই পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না।

কাজের অতীত ইতিহাস নিয়েও বিতর্ক

অভিযোগ রয়েছে, মায়ার লিমিটেড বিগত সরকার আমল থেকে বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিংসহ প্রায় ৬০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার বিভিন্ন কাজ করেছে। তবে সমালোচকদের দাবি, এসব প্রকল্পের অনেকগুলোই নির্ধারিত সময় ও শর্ত অনুযায়ী সম্পন্ন হয়নি। ফলে একই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বাধীন যৌথ উদ্যোগকে আবারও বড় প্রকল্প দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।

সর্বনিম্ন দরদাতার পাল্টা বক্তব্য

প্রকল্প পরিচালক কর্ণেল ফেরদৌস ও সদস্য (প্রকৌশল) রাকিবুল ইসলাম তালুকদার জানিয়েছেন, সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানের দাখিল করা টার্নওভারের নথিতে অসঙ্গতি ছিল, যা তাদের অযোগ্য ঘোষণার অন্যতম কারণ।

তবে কুমিল্লা ডকইয়ার্ড দাবি করেছে, তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু বেসরকারি টার্নওভার সংক্রান্ত নথি জমা দিয়েছিল। টেন্ডারের শর্ত পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় টার্নওভার তাদের ছিল এবং সেই নথিও দাখিল করা হয়েছিল। তাই তাদের অযোগ্য ঘোষণার সিদ্ধান্তকে তারা প্রশ্নবিদ্ধ বলে দাবি করেছে।

উল্লেখ্য, এসব অভিযোগ অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানের দাবি। অন্যদিকে প্রকল্প পরিচালক অভিযোগগুলো অস্বীকার করে টেন্ডার প্রক্রিয়া বিশ্বব্যাংকের নীতিমালা ও ই-জিপি ব্যবস্থার আওতায় সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বাধীন তদন্তের পরই চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারিত হবে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।