৩০ বিঘা জমির প্রকল্প প্রচারণা, নথিতে জমি ৫.৭৪ বিঘা; মালিকানা ও শেয়ার বিক্রি নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। ফাইল ছবি
পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না থাকা এবং মাস্টারপ্ল্যানের শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে ‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট’ প্রকল্পের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। মঙ্গলবার দুপুরে কুয়াকাটা পৌরসভা ও কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসন যৌথভাবে এ পদক্ষেপ নেয়। নির্মাণস্থলে টাঙিয়ে দেওয়া হয় নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত ব্যানার। তবে নির্মাণকাজ বন্ধের ঘটনা শুধু অনুমোদনের প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রকল্পের জমির পরিমাণ, মালিকানা, বায়না দলিল, বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রি এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে আগে থেকেই নানা প্রশ্ন ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে।
মঙ্গলবার দুপুরে কুয়াকাটা সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব ও কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান এবং কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেকের উপস্থিতিতে অভিযান পরিচালিত হয়। পৌরসভার প্রশাসক ইয়াসীন সাদেক জানান, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ভবন নির্মাণ আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। তা ছাড়া কুয়াকাটার মাস্টারপ্ল্যানে ওই জমি রেলওয়ের স্থাপনার জন্য বরাদ্দ রয়েছে। এসব কারণেই নির্মাণকাজ বন্ধ করা হয়েছে। বর্তমান বিএস জরিপ অনুযায়ী, জায়গাটি কুয়াকাটা পৌরসভার আওতাধীন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। নির্মাণস্থলে টাঙানো ব্যানারে অনুমোদনহীন স্থাপনা নির্মাণের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
৩০ বিঘার প্রচারণা, নথিতে জমি ৫.৭৪ বিঘা
প্রকল্পটির প্রচারণায় ৩০ বিঘা জমির ওপর হোটেল ও রিসোর্ট গড়ে তোলার কথা বলা হলেও অনুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্রে এ দাবির সঙ্গে জমির পরিমাণের ব্যাপক অসংগতি দেখা গেছে। হোটেল নির্মাণের জন্য কুয়াকাটা পৌরসভায় জমা দেওয়া তফসিলে জমির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছিল ১ দশমিক ৯২ একর, যা প্রায় ৫ দশমিক ৭৪ বিঘার সমান।

গত ৭ জানুয়ারি পৌরসভা থেকে এই পরিমাণ জমির বিপরীতে প্রাথমিক অনুমোদন নেওয়া হলেও এর প্রায় ছয় মাস আগেই ৩০ বিঘার বিশাল প্রকল্পের কথা বলে শেয়ার বিক্রি শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তারা ২১ বিঘা জমি কিনেছে এবং বাকি ৯ বিঘার বায়না করেছে। তবে এ দাবির সপক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো দলিল বা কাগজপত্র দেখাতে পারেনি বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা
প্রকল্পের জমির মালিকানা ও বায়না-সংক্রান্ত প্রক্রিয়াতেও রয়েছে আইনি জটিলতা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডি এম এমদাদুল হক কুয়াকাটায় ১৬ জনের কাছ থেকে ১৭ দশমিক ৫৫৯ বিঘা জমির বায়না দলিল করেছেন। তবে এসব জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে একাধিক মামলা চলমান রয়েছে।
পটুয়াখালীর খেপুপাড়া সাবরেজিস্ট্রি অফিস বায়না দলিলের ক্ষেত্রে শর্ত দিয়েছে, বরিশালের বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে অনুমতি পাওয়ার পরই কেবল জমি হস্তান্তর করা যাবে। ফলে বায়না করা জমিকে নিশ্চিত মালিকানাধীন সম্পত্তি হিসেবে উপস্থাপন করে শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
উত্তরাধিকার দাবি, রাখাইন সম্প্রদায়ের অভিযোগ
অন্যদিকে, জমির প্রকৃত মালিকানা দাবি করে একাধিক পক্ষ সোচ্চার হয়েছে। স্থানীয় চার বাসিন্দা উত্তরাধিকারসূত্রে জমির অধিকার দাবি করে পটুয়াখালীর যুগ্ম জেলা জজ আদালতে দেওয়ানি মামলা করেছেন।
এ ছাড়া কুয়াকাটার বালিয়াতলীর হাড়িপাড়া রাখাইন পল্লির বাসিন্দারাও সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেছেন, তাঁদের পূর্বপুরুষদের সিএস, আরএস ও এসএ খতিয়ানের জমির ওপর প্রভাবশালীরা সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করছেন।
রাখাইন সম্প্রদায়ের পক্ষে বোচান ২০২৪ সালের নভেম্বরে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় আব্দুল জব্বার হাওলাদারসহ ৮৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে হোটেল কর্তৃপক্ষ রাখাইন সম্প্রদায়ের এ দাবি পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছে।
আইনি জটিলতার মধ্যেই শেয়ার ও প্যাকেজ বিক্রি
জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিষয়টি সুরাহা হওয়ার আগেই প্রকল্পটির শেয়ার ও প্যাকেজ বিক্রির বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রকল্পটিকে ৪৩ হাজার শেয়ারে ভাগ করে ২৬ হাজার প্যাকেজের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে প্রচার চালানো হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি অনুযায়ী, প্রায় ১০ হাজার প্যাকেজে অন্তত ২২ হাজার শেয়ার ইতিমধ্যে বিক্রি হয়েছে।
ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং ম্যানেজার মো. রাকিবুল ইসলাম এবং সহকারী জেনারেল ম্যানেজার মিজানুর রহমান তুহিন জানান, বিনিয়োগকারীরা পূর্ণাঙ্গ দলিলপত্র বা অনুমোদন দেখতে চান না। বরং প্রয়াত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে ও পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদীর নাম ও বক্তব্যে বিশ্বাস রেখেই মানুষ বিনিয়োগ করছেন বলে তাঁদের দাবি।
উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে মাসুদ সাঈদীকে চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘হালাল ট্যুরিজম’ প্রকল্প হিসেবেও এর প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মাসুদ সাঈদীর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজন স্বচ্ছতা
কুয়াকাটার মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে বড় বিনিয়োগের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইনগত অনুমোদন, জমির প্রকৃত মালিকানা এবং বিনিয়োগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে জমির মালিকানা নিয়ে একাধিক মামলা চলমান থাকা এবং প্রকল্পের জমির পরিমাণ নিয়ে নথি ও প্রচারণায় অসংগতি দেখা দেওয়ায় বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে প্রশাসনের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা মেনে যথাযথ অনুমোদন অর্জন, জমির বিরোধের আইনি নিষ্পত্তি এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার ওপর। একই সঙ্গে প্রকল্পের জমির পরিমাণ, মালিকানা ও শেয়ার বিক্রির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
