জাল সিল, ব্যাকডেটেড ফাইল, টেন্ডার কারসাজি ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ • দুদকে একাধিক আবেদন • প্রশাসকের উন্নয়ন উদ্যোগের আড়ালে অনিয়মের অভিযোগ, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি নগরবাসীর। ফাইল ছবি
সিলেট সিটি করপোরেশনে (সিসিক) দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি রাজস্ব ক্ষতি, টেন্ডার কারসাজি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাঁদের বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগ তুলে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক আবেদন জমা দিয়েছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকেরা। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে সিসিকের প্রশাসনিক ও প্রকৌশল বিভাগের বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নগরবাসীর নাগরিক সেবা, সড়ক, ড্রেনেজ ও অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ করা সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার কথা থাকলেও, অভিযোগ রয়েছে—একটি অসাধু চক্রের কারণে উন্নয়ন প্রকল্প, ভবনের নকশা অনুমোদন, ঠিকাদারি কার্যক্রম, গৃহকর নির্ধারণ, লাইসেন্স প্রদান এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন খাতে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ করা জরুরি।
প্রশাসকের উন্নয়ন উদ্যোগের আড়ালে অনিয়মের অভিযোগ
সিলেট সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করা এবং নাগরিকদের সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন। বিভিন্ন স্থানে অনিয়মের অভিযোগ পেলে তিনি সরাসরি গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলছেন বলেও জানা গেছে।
কিন্তু নগর ভবনের অভ্যন্তরে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ প্রশাসকের উন্নয়ন উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। একদিকে নাগরিক সেবার মান বাড়ানোর চেষ্টা, অন্যদিকে সরকারি অর্থের অপব্যবহার ও দাপ্তরিক কাজে অনিয়মের অভিযোগ—এই দুই বিপরীত চিত্র ঘিরে সিসিকের প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সম্প্রতি সিসিকের ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ তুলে দুদকের ঢাকা কার্যালয়ে লিখিত আবেদন করেছেন এক ভুক্তভোগী। অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে কি না, তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এর আগে সিসিকের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোহাম্মদ সাদিকুর রহমানসহ একাধিক ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিক দুদকের প্রধান কার্যালয়ে ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম এবং সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক নথিপত্র উল্লেখ করে নিরপেক্ষ তদন্তের আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের অভিযোগ, যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্ব হওয়ায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের বিষয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত রয়েছে।
বদলির পরও নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ, ব্যাকডেটেড ফাইল নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগের বর্ণনা অনুযায়ী, সিসিকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুল রহমান এবং সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আকবরকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের অভিযোগ রয়েছে। নূর আজিজুল রহমান বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রেষণে কর্মরত এবং আলী আকবর বগুড়ায় বদলি হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কর্মস্থল পরিবর্তনের পরও সিসিকের কিছু দাপ্তরিক ফাইল, ঠিকাদারি কার্যক্রম এবং নকশা অনুমোদনসংক্রান্ত বিষয়ে তাঁদের প্রভাব বজায় রয়েছে। এমনকি পুরোনো তারিখ দেখিয়ে ফাইল প্রস্তুত, কমিশন বাণিজ্য এবং পুনরায় সিসিকে ফিরে আসার জন্য তদবিরের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট ফাইল, অনুমোদনপ্রক্রিয়া, আর্থিক লেনদেন ও দাপ্তরিক যোগাযোগ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
জাল সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহারের অভিযোগ
সিসিকের প্রশাসনিক ও প্রকৌশলসংক্রান্ত নথি, নকশা যাচাই এবং সরকারি পে-অর্ডার জমা দেওয়ার নির্ধারিত প্রক্রিয়া রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সেই প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে নগরীর সুরমা মার্কেট থেকে সিসিকের সাবেক মেয়র, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সচিব, প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলীসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক সিলের অনুরূপ সিল তৈরি করা হয়েছিল।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সরকারি নথিতে অনুমোদন দেখাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর নকল এবং পুরোনো তারিখে ফাইল প্রস্তুতের মাধ্যমে অনিয়ম করা হতো। একটি নির্দিষ্ট কক্ষে বসে অবৈধ ইমারতের নকশা ও ব্যাকডেটেড ফাইল তৈরির অভিযোগও রয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, সরকারি নথির নিরাপত্তা ও অনুমোদনপ্রক্রিয়ার গুরুতর দুর্বলতার ইঙ্গিত দিতে পারে। তাই জব্দযোগ্য নথি, সিল তৈরির উৎস, স্বাক্ষরের নমুনা এবং অনুমোদিত ফাইলের সঙ্গে বিতর্কিত নথি মিলিয়ে তদন্ত করা জরুরি।
চাকরি স্থায়ীকরণের আশ্বাসে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ
সিসিকে কর্মরত প্রায় ২৫৮ জন অস্থায়ী ও দিনমজুর কর্মচারীকে চাকরি স্থায়ী করার আশ্বাস দিয়ে হাইকোর্টের প্রসেসিং ফি বাবদ জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এভাবে মোট ২৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা আদায় করা হয়।
কর্মচারীদের দাবি হিসেবে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, টাকা ফেরত চাইলে তাঁদের চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়া হতো। তবে অর্থ আদায়ের সঙ্গে কারা জড়িত, টাকা কার কাছে জমা হয়েছে এবং এ বিষয়ে কোনো আদালত-সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া ছিল কি না—এসব তথ্য নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সাবেক প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুল রহমানকে ঘিরে একাধিক অভিযোগ
সিসিকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুল রহমানের বিরুদ্ধে গত দুই দশকে ড্রেনেজ, ছড়া ও নগর উন্নয়ন প্রকল্পের শত শত কোটি টাকার বরাদ্দে প্রভাব বিস্তার, নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, কমিশন বাণিজ্য এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘন করে নকশা অনুমোদনের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিবরণে বলা হয়েছে, ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার সময় যৌথ বাহিনী তাঁকে ঘুষ গ্রহণ ও টেন্ডার জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছিল। এ-সংক্রান্ত মামলা ও নথির বর্তমান অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া, ২০২৩ সালের ২৩ মে সিসিকের নির্মাণাধীন বহুতল ভবন থেকে ভারী স্টিলের পাইপ পড়ে ল্যান্স করপোরাল মো. দেলোয়ার হোসেন নামের এক সেনাসদস্যের মৃত্যুর ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা মামলায় নূর আজিজুল রহমানের নাম ১ নম্বর অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। মামলার নম্বর হিসেবে ২৪/১৫০ উল্লেখ রয়েছে।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা মামলা নম্বর ০১ এবং সিআর মামলা নম্বর ৩৫২-এও তাঁর নাম এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব মামলার বর্তমান অবস্থা, অভিযোগের প্রকৃতি এবং আদালতের নথি যাচাই ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ঢাকায় কর্মরত থাকলেও সিসিকের কিছু পুরোনো ফাইল প্রস্তুত ও অনুমোদনসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে তাঁর প্রভাব রয়েছে। এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি ও অনুমোদনপ্রক্রিয়া পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
মো. আলী আকবরের বিরুদ্ধে টেন্ডার ও তদন্ত-স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন
সিসিকের সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আকবরের বিরুদ্ধে দীর্ঘ কর্মজীবনে টেন্ডার বাণিজ্য, প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন উন্নয়নকাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০৭ সালে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী নূর আজিজুল রহমানের মাধ্যমে নাটোর পৌরসভা থেকে তিনি সিসিকে যোগ দেন।
কদমতলীর নতুন সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ার পর গঠিত তদন্ত কমিটিতে তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে তাঁর আপন ভাই প্রকল্প প্রকৌশলী হিসেবে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও তাঁকে কমিটির সমন্বয়ক করা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত ছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, তিনি একটি মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও তাঁর দাপ্তরিক অবস্থান যাচাই করে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।
রাজিউদ্দিন খানের বিরুদ্ধে অবৈধ ভবন অনুমোদন ও সম্পদের অভিযোগ
সিসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী (পূর্ত) মো. রাজিউদ্দিন খানের বিরুদ্ধে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত শর্ত উপেক্ষা করে ঝালোপাড় এলাকায় মাত্র তিন ফুট প্রশস্ত রাস্তার ওপর বহুতল ভবন নির্মাণের সুযোগ দেওয়া এবং ঘুষের বিনিময়ে নকশাবহির্ভূত ভবন অনুমোদনের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নগরীর গোয়াবাড়িতে আনুমানিক এক কোটি টাকা মূল্যের নামফলকহীন বিলাসবহুল বাংলো, প্রায় ৪৫ লাখ টাকার ব্যক্তিগত গাড়ি এবং একাধিক জমির মালিক হয়েছেন তিনি। এসব সম্পদের অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
যুক্তরাজ্যপ্রবাসী কায়সার রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে তাঁর বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগসংক্রান্ত নথিপত্র প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে সম্পদের প্রকৃত মূল্য, মালিকানা এবং অর্থের উৎস যাচাইয়ের জন্য ভূমি নিবন্ধন, আয়কর বিবরণী, ব্যাংক লেনদেন ও বৈধ আয়ের তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এটিএম সাইদুর রহমান ও বেলাল আহমেদকে ঘিরে অভিযোগ
সিসিকের উপসহকারী প্রকৌশলী এটিএম সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং ১৫ লাখ টাকার একটি বিলে দেড় লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া, খাদিম এলাকায় তাঁর সুবিশাল গরুর খামার ও প্রাসাদোপম বাড়ি রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ২১ নম্বর ওয়ার্ডের অতিরিক্ত সহকারী প্রকৌশলী বেলাল আহমেদের বিরুদ্ধে সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আকবরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করা এবং বেআইনি ভবনের অনুমোদনপ্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট টেন্ডার নথি, বিল, অনুমোদনপত্র এবং সম্পদের তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
গৃহকর নির্ধারণে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ
সিসিকের প্রধান অ্যাসেসর মো. আব্দুল বাতিতের বিরুদ্ধে নগরীর বাণিজ্যিক ভবন, বহুতল আবাসিক ভবন ও অভিজাত মার্কেটের গৃহকর প্রকৃত পরিমাণের তুলনায় অস্বাভাবিক কম নির্ধারণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এর ফলে সিটি করপোরেশন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
গৃহকর নির্ধারণে ভবনের আয়তন, ব্যবহার, অবস্থান, মূল্যায়ন এবং প্রযোজ্য বিধিমালা বিবেচনার কথা। কোনো ভবনের কর ইচ্ছাকৃতভাবে কম নির্ধারণ করা হয়েছে কি না, তা বুঝতে একই ধরনের ভবনের মূল্যায়ন, কর নির্ধারণের নথি এবং সংশোধিত হিসাব তুলনা করে দেখা প্রয়োজন।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও লাইসেন্স শাখায় অনিয়মের অভিযোগ
সিসিকের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবদীনের বিরুদ্ধে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শাখা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে অর্থের পরিমাণ কোটি টাকা পর্যন্ত বলে দাবি করা হলেও, সংশ্লিষ্ট বিল, চুক্তি, কাজের পরিমাণ ও আর্থিক লেনদেন যাচাই ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
অন্যদিকে, লাইসেন্স শাখার প্রধান রুবেল আহমেদের বিরুদ্ধে মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স নবায়ন ও নতুন লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নিজস্ব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ টাকা অবৈধভাবে আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে লাইসেন্সের আবেদন, সরকারি ফি জমার রসিদ, নবায়নের সময়সীমা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব বণ্টনের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার তদারকি নিয়েও প্রশ্ন
সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ রেজাই রাফিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রমে যথাযথ তদারকির ঘাটতি এবং কথিত জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ তাঁর পরোক্ষ মদদের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
তবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পরোক্ষ মদদ বা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত, দাপ্তরিক নথি, লিখিত অভিযোগের পর গৃহীত পদক্ষেপ এবং দায়িত্ব পালনের রেকর্ড পর্যালোচনা করা জরুরি। শুধু পদমর্যাদা বা প্রশাসনিক দায়িত্বের ভিত্তিতে ব্যক্তিগত দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
প্রকল্প বাতিল, জ্বালানি তেল ও ভাউচার নিয়ে নতুন প্রশ্ন
সিসিকের প্রকল্প ও জ্বালানি খাতেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ নেওয়ার পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজ না করেই বা বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে, কী পরিমাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং বাতিলের সিদ্ধান্ত বিধিসম্মত ছিল কি না—তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
এ ছাড়া, বাতিল বা বাস্তবায়ন না হওয়া প্রকল্পের নাম ব্যবহার করে সরকারি গাড়ির জ্বালানি ভাউচার তৈরি, পাম্প থেকে কম পরিমাণ তেল গ্রহণ এবং অবশিষ্ট জ্বালানি বাইরে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এভাবে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
প্রকল্পের বরাদ্দ, বিল-ভাউচার, গাড়ির লগবুক, জ্বালানি উত্তোলনের হিসাব এবং পাম্পের সরবরাহ রেজিস্টার মিলিয়ে পরীক্ষা করলে এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব। অনুসন্ধান করতে গিয়ে সাংবাদিকদের হুমকি-ধমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি
সিলেট সিটি করপোরেশন নগরবাসীর অর্থে পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। এখানে নাগরিক সেবা, অবকাঠামো উন্নয়ন, ভবনের নকশা অনুমোদন, গৃহকর নির্ধারণ, লাইসেন্স প্রদান এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর উন্নয়ন উদ্যোগ কার্যকর রাখতে এবং নগরবাসীর নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকেরা। তাঁদের দাবির মধ্যে রয়েছে—অভিযোগে উল্লিখিত নথিপত্র যাচাই, সরকারি অর্থের হিসাব নিরীক্ষা, কথিত অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং দায় প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ।
একই সঙ্গে অভিযুক্ত প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বক্তব্য নেওয়া, অভিযোগের পক্ষে-বিপক্ষে প্রমাণ পরীক্ষা করা এবং তদন্তের ফল জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি উঠেছে। প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে, আবার প্রভাবশালী হওয়ার কারণে কোনো অভিযোগ উপেক্ষা না করে—আইন ও নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণই হতে পারে সিসিকের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কার্যকর পথ।
এখন মূল প্রশ্ন—সিসিকের ১৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত কত দ্রুত শুরু হবে, আর সরকারি অর্থ ও নথিপত্রের অনিয়মের সত্যতা মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? নগরবাসীর প্রত্যাশা, অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হবে এবং সিলেট সিটি করপোরেশনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নাগরিক সেবার মান নিশ্চিত হবে।
