যমুনার আরবরিকালচার বিভাগ থেকে প্রত্যাহার, মানিকগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজে গাছ না লাগিয়েই ভুয়া বিল-ভাউচার; নিরপেক্ষ তদন্ত ও শাস্তির দাবি। ফাইল ছবি
সরকারি স্থাপনায় সবুজায়ন ও পরিবেশ রক্ষার মতো মহৎ উদ্যোগকে অর্থ আত্মসাতের হাতিয়ার বানানোর অভিযোগ উঠেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে। মানিকগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের আঙিনায় গাছ না লাগিয়েই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছেন প্রধান বৃক্ষপালনবিদ আবুল কালাম আজাদ।
এদিকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার গণপূর্ত আরবরিকালচার বিভাগের উপ-বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. মোয়াজ্জেম হোসেনকে অবশেষে ওই পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাঁর স্থলে নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন মো. রুহুল কুদ্দুস। তবে এই প্রত্যাহারকে যথেষ্ট মনে করছেন না গণপূর্তের একাধিক কর্মকর্তা। তাঁদের দাবি, শুধু পদ থেকে সরিয়ে দিলেই চলবে না; অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
রাজনৈতিক পরিচয় বদলে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকার অভিযোগ
মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকা এবং পটপরিবর্তনের পর নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর ডিও লেটার ও দলীয় শীর্ষ নেতাদের আশীর্বাদে তিনি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও অতি সংবেদনশীল স্থাপনায় দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-১ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে কাজ করা এবং জালভোট প্রদানে সহায়তার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মোয়াজ্জেম হোসেন নিজেকে বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তন ঘটলেও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের অবসান হয়নি। বরং নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুরোনো নথিতেও অনিয়মের অভিযোগ
মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। ২০০৯, ২০১১ ও ২০১২ সালের সরকারি নথিপত্রে তাঁর বিরুদ্ধে চাকরিতে অসদাচরণ, অর্থ আত্মসাৎ এবং অর্থঋণ আদালতের মামলায় ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি হওয়ার বিষয় উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অদৃশ্য প্রভাবের কারণে বারবার পার পেয়ে গেছেন তিনি। ঢাকায় নামে-বেনামে বিপুল অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলা এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই এবং আইনানুগ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা জরুরি।
গাছ না লাগিয়েই কোটি টাকার বিল?
মানিকগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের আঙিনায় সবুজায়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগটি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় একটি গাছও না লাগিয়ে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে কোটি কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রধান বৃক্ষপালনবিদ আবুল কালাম আজাদ মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছেন বলে জানা গেছে।
সরকারি অর্থ ব্যয়ে পরিবেশবান্ধব প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিবর্তে যদি কাগজে-কলমে কাজ দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হয়ে থাকে, তাহলে তা শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, সরকারি সম্পদের অপব্যবহারেরও গুরুতর অভিযোগ। এ ক্ষেত্রে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, বিল-ভাউচার, কাজের পরিমাপ ও অর্থ উত্তোলনের নথি যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তদন্তের দাবি
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
পরিবেশবান্ধব সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ এবং রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকার বিষয়টি নিয়ে সচেতন মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, শুধু পদ থেকে প্রত্যাহার করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। গণপূর্ত অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
আরো বিস্তারিত তথ্য নিয়ে থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে।
