জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) যেন অনিয়ম-দুর্নীতির এক দুর্ভেদ্য অভয়ারণ্য! দেশে গণঅভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও জনগুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটির ভাগ্যে যেন কোনো সুবাতাস লাগেনি; বরং অভিযোগ রয়েছে, পুরনো প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের হাত ধরে দুর্নীতির সেই ধারাই নতুন করে বেগবান হয়েছে। ছাত্রলীগ নেতা পরিচয়ে আওয়ামী লীগ আমলে যারা ক্ষমতাবান ছিলেন এবং অনিয়ম-দুর্নীতির নানা অভিযোগে আলোচিত ছিলেন, তাদেরই কেউ কেউ বর্তমান সরকারের আমলেও নতুন করে সিন্ডিকেট গড়ে পুরনো প্রভাব ধরে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে ডিপিএইচইর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও অসন্তোষ।
আর এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়াল। অভিযোগ রয়েছে, জ্যেষ্ঠতার নিয়ম উপেক্ষা করে নজিরবিহীন দ্রুততায় পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়ে তিনি এখন অধিদপ্তরের অন্যতম ক্ষমতাধর কর্মকর্তা।
প্রকৌশলী আবদুল আউয়ালের মূল পদ নির্বাহী প্রকৌশলী। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, নিজ পদের অতিরিক্ত হিসেবে তিনি একে একে অধিদপ্তরের আরও শীর্ষ তিনটি পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে আওয়ামী লীগ আমলে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে অন্যদের ডিঙিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব পান তিনি। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকে একই সঙ্গে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ত) এবং প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্বও পান, যা সংশ্লিষ্টদের মতে অত্যন্ত বিরল ঘটনা।
অভিযোগ রয়েছে, যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে এভাবে উচ্চ পদে পদায়নের নেপথ্যে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল এবং সেখানে প্রায় ৩৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই প্রয়োজন। অভিযোগকারীদের দাবি, পদ বাগিয়ে নেওয়ার পর সেই অর্থ তুলতে আবদুল আউয়াল এখন আরও মরিয়া হয়ে উঠেছেন এবং অধিদপ্তরে অনিয়ম-দুর্নীতির পরিধি বাড়ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তাকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদী ও উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার প্রভাবে তাকে এসব দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা তথ্য থাকলেও সেগুলো আমলে নেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি বহাল থাকায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা যেভাবে সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর কর্মকর্তা
প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়ালের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, কুয়েটে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। কর্মজীবনে নিজেকে আওয়ামী লীগ-সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি অধিদপ্তরের অন্যান্য কর্মকর্তার ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৫ বছরের শাসনামলে তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। অভিযোগ রয়েছে, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও পদ বাগিয়ে নেন। বিশেষ করে ময়মনসিংহের আওয়ামী লীগের সাবেক দুই সংসদ সদস্য মাহমুদ হাসান ও আব্দুস সাত্তারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিতি কাজে লাগিয়ে ডিপিএইচইতে নিজের প্রভাব বিস্তার করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
৫ আগস্ট ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিস্থিতি বদলে গেলেও অভিযোগ অনুযায়ী, আবদুল আউয়ালও দ্রুত নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেন। যেখানে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছিল, সেখানে উল্টো তার প্রভাব আরও বেড়ে যায় বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদী ও উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার প্রভাবে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে একজন নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্বে আসীন হওয়ার ঘটনাকে সংশ্লিষ্টরা প্রশাসনিক ইতিহাসের ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখছেন।
মো. আবদুল আউয়াল ১৯৯৮ সালের ৫ মার্চ একটি প্রকল্পে (জিওবি-ডানিডা) যোগদান করেন। ২০০৬ সালে তিনি রাজস্ব খাতে আসেন এবং ২০১৩ সালে চাকরিতে নিয়মিত হন। অথচ অধিদপ্তরে তার চেয়ে জ্যেষ্ঠ এবং দীর্ঘদিনের চাকরি রেকর্ড থাকা অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের পাশ কাটিয়ে গত ১৭ নভেম্বর ২০২৫ তাকে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
এরপর গত ৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ত) পদে দায়িত্ব পাওয়ার জন্য আবেদন করেন তিনি। অভিযোগ অনুযায়ী, অস্বাভাবিক দ্রুততায় ফাইল অনুমোদন হয়ে ১১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রজ্ঞাপন জারি হয়। মাত্র দুই মাসেরও কম সময়ে একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব এবং একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে থাকার ঘটনাকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অত্যন্ত বিরল বলে মনে করছেন।
অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে অভিযোগ রয়েছে, আবদুল আউয়ালের এই দ্রুত উত্থানের পেছনে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, শীর্ষ পদটি পেতে প্রায় ৩৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ৫ কোটি টাকা তৎকালীন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদীর কাছে এবং বাকি অর্থ সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তবে এ দাবির স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
জাহেদী ও আউয়াল—উভয়ের বাড়ি ময়মনসিংহ হওয়ায় কথিত ‘আঞ্চলিক সিন্ডিকেট’ আরও শক্তিশালী হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। আরও অভিযোগ, প্রধান প্রকৌশলী পদে দায়িত্ব দেওয়ার আগে ২০২৫ সালের মে মাসে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) থেকে পাঁচ কর্মকর্তার মূল্যায়ন প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছিল। আবদুল আউয়াল সম্পর্কে সেই প্রতিবেদনে দুর্নীতির তথ্য থাকার দাবি করা হলেও রহস্যজনকভাবে তা উপেক্ষা করে তাকে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
আওয়ামী আমলে আউয়ালের যত অপকর্ম
প্রকৌশলী আউয়ালের বিরুদ্ধে বেতনসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯৯৮ সালে প্রকল্পে যোগদান করলেও ২০০৬ সালে তিনি রাজস্ব খাতে আসেন। এরপর ২০০২ সালে সিলেকশন গ্রেড নিয়ে ৭ম গ্রেড, ২০০৮ সালে ৬ষ্ঠ গ্রেড এবং ২০১৮ সালে ৫ম গ্রেডে বেতন উত্তোলন করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে অগ্রিম বেতন উত্তোলনের মাধ্যমে সরকারি অর্থের বড় ধরনের ক্ষতি করা হয়েছে। বিষয়টি প্রতারণা, জালিয়াতি ও আর্থিক অনিয়মের আওতায় পড়ে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
রুটিন দায়িত্ব পাওয়ার পর দ্রুত সময়ে কথিত ‘খরচের টাকা’ ওঠাতে আবদুল আউয়াল বিভিন্ন জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কাউকে কাউকে সরিয়ে দেওয়ার পরোক্ষ হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, আবদুল আউয়াল নরসিংদীতে নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে কর্মরত থাকার সময় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) অর্থায়িত সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নির্মাণে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সময়ে নরসিংদী পৌরসভায় প্রকল্পটি চালু করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও বিশেষ টিম গঠন করে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে হয়।
প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত এক ঠিকাদারের অভিযোগ, আবদুল আউয়াল ঠিকাদারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে অর্থ আদায় করতেন। চাহিদা অনুযায়ী টাকা না দিলে বিল থেকে বড় অংশ কেটে নেওয়া হতো বলে অভিযোগ ওই ঠিকাদারের। অন্যদিকে টাকা দিলে কাজের মান বা অন্যান্য অনিয়ম নিয়ে তেমন সমস্যা হতো না বলেও দাবি করা হয়েছে।
নরসিংদীতে নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে থাকাকালে বিভিন্ন পৌরসভা ও পল্লী অঞ্চলের উন্নয়ন প্রকল্পে জনস্বাস্থ্য খাতের একাধিক কাজে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়ালের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগে অধিদপ্তরের অনেক কর্মকর্তাও বিপাকে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নরসিংদী থেকে নিজ জেলা ময়মনসিংহে নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে পদায়ন নেওয়ার পর ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে কিশোরগঞ্জ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্ব পান তিনি।
এই দুই জেলায় দায়িত্ব পালনকালে কাগজপত্র ম্যানিপুলেশন ও টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে ক্রয় প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কিশোরগঞ্জ ও নরসিংদীতে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এসব বিষয় অডিট রিপোর্টে গুরুতর অনিষ্পন্ন আপত্তি হিসেবে চিহ্নিত এবং অডিটের ত্রিপক্ষীয় সভায় আলোচিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
২০১৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর আবদুল আউয়াল অধিদপ্তরের সিলেট সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর (চলতি দায়িত্ব) দায়িত্ব পান। পরে “কুলাউড়া ও গোলাপগঞ্জ পৌরসভার পানি সরবরাহ ও এনভায়রনমেন্টাল স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নতিকরণ প্রকল্প”-এর প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বও পান তিনি।
তবে অভিযোগ রয়েছে, তার অদক্ষতা ও অদূরদর্শিতার কারণে ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বর মেয়াদের প্রকল্পটি কার্যক্রম শুরুর আগেই সংকটে পড়ে। প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের পরও কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে ময়মনসিংহ সার্কেলে বদলি করা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
ময়মনসিংহে থাকাকালে তার বিরুদ্ধে আরও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। আওয়ামী লীগের ময়মনসিংহ-৮ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাহমুদ হাসানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এবং সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হওয়ায় ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে নিজ জেলায় যোগদান করেন বলে জানা যায়।
সরকারি কর্মকর্তাদের নিজ জেলায় পদায়ন নিয়ে সাধারণত বিধিনিষেধ থাকলেও আবদুল আউয়ালের ক্ষেত্রে তা কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন নিজ জেলা ময়মনসিংহে নির্বাহী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্ব পাওয়ার পর তার প্রভাব আরও বাড়ে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি ও নানা অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে।
নোয়াখালীর যে ঘটনা দেশব্যাপী আলোচনায়
নোয়াখালীতে ডানিডার অর্থায়নে সংরক্ষিত প্রায় ৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকার পাইপ ও নির্মাণসামগ্রী মাত্র ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় নিলামে বিক্রির অভিযোগটি সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দেয়।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, ডানিডার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন একটি প্রকল্পের আওতায় প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের পাইপ ও নির্মাণসামগ্রী নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের একটি গুদামে সংরক্ষিত ছিল। এসব মালামাল অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে কথিত দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে একটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে নিলামে তোলা হয়। ফলে অধিকাংশ ঠিকাদার বিষয়টি জানতে না পারায় দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেননি বলে অভিযোগ।
এ সুযোগে নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মেসার্স শাহনাজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ৬ কোটি টাকার মালামাল মাত্র ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর এই নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। গণমাধ্যমকে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, “আমি কোনো নিলাম দিইনি। নিলাম প্রক্রিয়া ঢাকা থেকে পরিচালিত হয়েছে।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, নিলাম প্রক্রিয়াটি আবদুল আউয়ালের সরাসরি নির্দেশনায় পরিচালিত হয়। এমনকি গত ১৫ জানুয়ারি নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম ঢাকায় এসে মহাখালীর একটি ব্যাংকের সামনে বিপুল পরিমাণ টাকা আউয়ালের প্রতিনিধির হাতে তুলে দেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এ দাবির স্বাধীন প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।
আউয়ালের দুর্নীতির অভিযোগ থেকে রেহাই পাননি অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীরাও
আবদুল আউয়ালের বিরুদ্ধে অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত সাধারণ কর্মচারীদের হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, পেনশন ও পিআরএল ফাইল অনুমোদনের জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে ১ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হতো। যারা টাকা দিতে পারতেন না, তাদের ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হতো বলে অভিযোগ।
নিজ জেলা ময়মনসিংহে থাকার সময় সাধারণ মেকানিক ও কর্মচারীদের বদলির ভয় দেখিয়ে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সরকারি কর্মকাণ্ডে আবদুল আউয়ালের অদূরদর্শিতার কারণে সাধারণ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ময়মনসিংহের ফুলপুর ও গৌরীপুর পৌরসভায় প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানি সরবরাহ প্রকল্পগুলো বর্তমানে অকেজো হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। গৌরীপুর পৌরসভার পাম্পচালকদের বেতন বাবদ বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় হলেও শহরবাসী এক ফোঁটা পানিও পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
নকশা অনুযায়ী কাজ না হওয়া এবং প্রকল্পের অর্থের অনিয়মের কারণে কোটি টাকার সরকারি সম্পদ নষ্ট হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
উল্লেখ্য, স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদীর গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলায় হওয়ায় তার প্রভাব কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও আবদুল আউয়াল ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পুরনো সিন্ডিকেট নতুন করে সক্রিয় করারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন উপদেষ্টাকে ম্যানেজ করে প্রকৌশলী তবিবুর রহমান তালুকদারকে প্রধান প্রকৌশলী করার একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে বিষয়টি আগেই প্রকাশ্যে আসায় সেই প্রক্রিয়া ভেস্তে যায় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। এরপর স্থানীয় সরকার বিভাগের তৎকালীন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে রাজি করিয়ে আবদুল আউয়ালকে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
‘এলাকার লোক’ পরিচয়কে সামনে আনা হলেও এর নেপথ্যে বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেন ছিল বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।
ডিপিএইচইর মতো জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে থাকা একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে এত বিপুলসংখ্যক অভিযোগ ওঠায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—অভিযোগগুলো কি কেবল অভিযোগই থাকবে, নাকি নিরপেক্ষ তদন্তে বেরিয়ে আসবে প্রকৃত সত্য?
অভিযোগের বিষয়ে মো. আবদুল আউয়ালের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যথাযথভাবে সংযুক্ত করা হবে।
