বৃহস্পতিবার, ২০শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পাসপোর্ট কর্মকর্তা মামুনের ঢাকায় ১৪ ফ্ল্যাটসহ অর্ধশত কোটি টাকার সম্পত্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক
আগস্ট ২০, ২০২৬ ১:৪৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ব্যাংকে ১৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, টাঙ্গাইল-মোড়েলগঞ্জেও বিপুল সম্পদের অভিযোগ। ফাইল ছবি

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের বরখাস্ত হওয়া পরিচালক মো. আবদুল্লাহ আল মামুন ও তার স্ত্রী শাহান আরার নামে রাজধানী ঢাকাতেই রয়েছে ১৪টি ফ্ল্যাটসহ অর্ধশত কোটি টাকার সম্পত্তি। এর বাইরে নিজ জেলা টাঙ্গাইল এবং শ্বশুরবাড়ি বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জেও বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে কোটি কোটি টাকা থাকার তথ্যও উঠে এসেছে। এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধান, দলিলপত্র ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট বিশ্লেষণে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

মো. আবদুল্লাহ আল মামুনকে ২০২৫ সালের এপ্রিলে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তার বিরুদ্ধে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে পাসপোর্ট দেওয়া এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুটি মামলাও করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

কে এই আবদুল্লাহ আল মামুন

২০০৪ সালের মে মাসে সহকারী পরিচালক হিসেবে পাসপোর্ট অধিদপ্তরে যোগ দেন মামুন। কর্মজীবনের শুরুতে কুমিল্লা ও নোয়াখালীতে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর হঠাৎ করেই ‘বিরাট প্রভাবশালী কর্মকর্তা’ হিসেবে আবির্ভূত হন বলে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের একাধিক কর্মী জানান। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং পরে মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ছত্রছায়ায় তার এমন উত্থান ঘটে বলে তাদের দাবি।

উপপরিচালক মামুনের দাপটে তখন পুরো দপ্তর তটস্থ থাকত বলেও অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা।

২০১৯ সালে পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পান আবদুল্লাহ আল মামুন। ওই বছরের জুনে রাজধানীর আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের পরিচালকের চেয়ারে বসেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের আশীর্বাদপুষ্ট হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন পর্যন্ত ওই পদে বহাল থেকে বিপুল সম্পদের মালিক হন মামুন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাসপোর্ট অফিসের একাধিক কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে জানান, প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুদিন সন্ধ্যার পর মামুন ধানমন্ডি ৫ নম্বরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সরকারি বাসভবনে যেতেন।

৫ আগস্টের পর মামুনকে সিলেটে বদলি করা হয়। সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক থাকাকালে ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই দিন তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে দুদক।

ঢাকার কোথায় কয়টি ফ্ল্যাট

দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে বরখাস্ত হওয়া পাসপোর্টের সাবেক পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন সরকারি চাকরির আড়ালে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজাত এলাকায় সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

অভিজাত ধানমন্ডি ও বসুন্ধরার পাশাপাশি মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ ও কাফরুল এলাকাতেও নিজের নামে অন্তত ১০টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনার তথ্য পাওয়া গেছে।

নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সাফকবলা দলিলে এসব ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি করা হয়। ঢাকা শহরের চারটি প্রধান এলাকায় বিস্তৃত এসব ফ্ল্যাটের বর্তমান আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

ধানমন্ডি ও এলিফ্যান্ট রোডে কোটি টাকার ফ্ল্যাট

রাজধানীতে মামুনের কেনা সবচেয়ে দামি ফ্ল্যাটগুলোর অবস্থান ধানমন্ডি ও আশপাশের এলাকায়। ধানমন্ডি ১১/এ রোডের ৭৭ নম্বর বাড়িতে তার নিজ নামে রয়েছে ২২৫১ বর্গফুটের একটি অভিজাত ফ্ল্যাট। দলিল নম্বর ১২৮১।

একই এলাকার নর্থ রোডের ৫০ নম্বর বাড়িতে ৯৮০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট এবং নিউ এলিফ্যান্ট রোডের ২২০ নম্বর হোল্ডিংয়ে ১০০০ বর্গফুটের আরও একটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার নামে। দলিল নম্বর যথাক্রমে ৩১১২ ও ১১১৫১। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এই তিন ফ্ল্যাটের মূল্য অন্তত ১১ কোটি টাকা বলে অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া হাজারীবাগের চরমোহনপুর সিকদার রিয়েল এস্টেটের ৭ নম্বর রোডে যৌথ মালিকানার জমিতে নির্মিত ভবনে ১৪০০ বর্গফুটের দুটি ফ্ল্যাটের মালিক আবদুল্লাহ আল মামুন। দলিল নম্বর ৭০৯৪ ও ৬২৮৩। এসব ফ্ল্যাটের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা বলে জানা গেছে।

মোহাম্মদপুর ও কাটাসুরেও একাধিক ফ্ল্যাট

মোহাম্মদপুর এলাকায় মামুনের আরও তিনটি ফ্ল্যাটের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কাটাসুরের ৪০/৩ নম্বর ‘হলি মদিনা’ ভবনের তৃতীয় তলায় দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। প্রতিটির আয়তন ১১০০ বর্গফুট। দলিল নম্বর ২২০২ ও ৮৭৬৪।

এ ছাড়া চাঁদ হাউজিংয়ের বি-ব্লকে ৭৬০ বর্গফুটের আরও একটি ফ্ল্যাট রয়েছে মামুনের নামে। দলিল নম্বর ৪০০৮। মোহাম্মদপুরের এই তিন ফ্ল্যাটের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

বসুন্ধরাতেও ফ্ল্যাট

বাড্ডা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অধীনে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ‘এফ’ ব্লকের ৪ নম্বর রোডের ‘হলি অর্ণব’ ভবনেও মামুনের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। দলিল নম্বর ৪৬৯৮। এর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা।

এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে পাওয়া ৯টি দলিলেই মামুনের নামে মোট ১০ হাজার ৭৯১ বর্গফুটের বেশি আয়তনের ফ্ল্যাটের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে।

এসব ফ্ল্যাটের বাইরে রাজধানীর ইবরাহিমপুরে যৌথ মালিকানায় ২০ কাঠার একটি প্লট কেনার তথ্যও পাওয়া গেছে। ওই জমিতে ১৮ জন মিলে বহুতল ভবন গড়ে তুলেছেন বলে জানা গেছে।

স্ত্রী শাহান আরার নামেও বিপুল সম্পত্তি

আবদুল্লাহ আল মামুনের স্ত্রী শাহান আরার নামেও বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও জোয়ার সাহারা এলাকায় তার নামে একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে।

এর মধ্যে ধানমন্ডির ৪ নম্বর রোডে প্রায় ৫ কোটি টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে শাহান আরার নামে। কাটাসুরের একই এলাকায় নিজের পাশাপাশি স্ত্রীর নামেও একাধিক ফ্ল্যাট কিনেছেন মামুন।

ধানমন্ডি রাজস্ব সার্কেলের ৬ কাটাসুর মৌজার ১২৫০৯ দাগে যৌথ মালিকানার দশমিক ৪৮ শতাংশ জমিতে, খতিয়ান নম্বর ১৬৮৪৯, কমপক্ষে ২ কোটি টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে শাহান আরার নামে।

৩ নম্বর মোহাম্মদপুর মৌজাতেও রয়েছে মামুনের স্ত্রীর নামে একটি ফ্ল্যাট। ওই মৌজার ৫৫ নম্বর দাগের ১০৮০৭ নম্বর খতিয়ানের জমির ওপর নির্মিত ভবনে থাকা ফ্ল্যাটটির দাম দেড় কোটির বেশি বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া ক্যান্টনমেন্ট রাজস্ব সার্কেলের অধীনে জোয়ার সাহারা এলাকার একটি জমিতে নির্মিত ভবনেও শাহান আরার নামে প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। দাগ নম্বর ২৬০০৯, খতিয়ান ৫৪১১৩ এবং মৌজা ৩ জোয়ার সাহারা।

অনুসন্ধানে পাওয়া দলিল ও নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মামুন যে সময়ে নিজের নামে বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট কিনেছেন, প্রায় একই সময় ওইসব এলাকার আশপাশে স্ত্রীর নামেও সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন।

ব্যাংক হিসাবে কোটি কোটি টাকা

আবদুল্লাহ আল মামুনের চারটি ব্যাংকে পাঁচটি হিসাবের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব হিসাবে চলতি বছরের ১৫ জুন পর্যন্ত লেনদেনের স্টেটমেন্ট সংগ্রহ করা হয়েছে। স্টেটমেন্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ইসলামী ব্যাংকে মামুনের দুটি হিসাবে যথাক্রমে ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৮৮ হাজার ৪৩৪ টাকা এবং ১ কোটি ৪৮ লাখ ৬১ হাজার ৮৬ টাকা জমা রয়েছে।

এ ছাড়া ট্রাস্ট ব্যাংকের হিসাবে ২০ লাখ ৭০ হাজার ৩০৩ টাকা, সোনালী ব্যাংকের হিসাবে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৯৬৭ টাকা এবং জনতা ব্যাংকের হিসাবে ২ হাজার ৬৬৩ টাকা পাওয়া গেছে।

সব মিলিয়ে এসব ব্যাংক হিসাবে আবদুল্লাহ আল মামুনের রয়েছে ১৭ কোটি ৮৮ লাখ ৫৬ হাজার ৮৫৩ টাকা।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এর বাইরে আত্মীয়স্বজনের নামে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ এফডিআরও রয়েছে মামুনের। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নথিপত্র অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।

সম্পদের সঙ্গে সরকারি আয়ের সামঞ্জস্য কতটা?

মামুনের নামে থাকা সম্পদের দীর্ঘ ফিরিস্তির সঙ্গে তার সরকারি চাকরি থেকে পাওয়া বেতন-ভাতার সামঞ্জস্য কতটা—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।

এ বিষয়ে পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও মামুন সাময়িক বরখাস্ত থাকায় তার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি পাসপোর্ট অধিদপ্তর।

তবে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে আবারও চাকরিতে ফিরতে জোর তদবির চালাচ্ছেন মামুন।

বক্তব্য দেবেন না মামুন

সম্পদের বিষয়ে জানতে আবদুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে কথা বলেছে এশিয়া পোস্ট। ২০ বছরের চাকরিজীবনে কীভাবে এত বিপুল সম্পদ অর্জন করা সম্ভব হলো—এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

তবে তার নামে বিপুল সম্পত্তি থাকার বিষয়টিও তিনি সরাসরি অস্বীকার করেননি।

অভিযোগ ও অনুসন্ধানে উঠে আসা এসব সম্পদের উৎস, সরকারি আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য এবং ব্যাংক হিসাবে থাকা বিপুল অর্থের বৈধতা এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুদকের করা মামলার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নথি ও আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে—দুই দশকের সরকারি চাকরিতে আবদুল্লাহ আল মামুনের এই বিপুল সম্পদ গড়ে ওঠার প্রকৃত উৎস কী।

এসব অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত থাকবে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে…….

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।