বুধবার, ১৯শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ড. ইউনূসকে নিয়ে মনিরুলের বিস্ফোরক দাবি, হাসিনাকে ২০২৩ সালেই করেছিলেন সতর্ক

অনলাইন ডেস্ক
আগস্ট ১৮, ২০২৬ ১১:২৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সরকার পরিবর্তনের ‘ছক’ নিয়ে রিপোর্ট, ৫ আগস্টের পতন ও কথিত ‘ডিপস্টেট’ প্রসঙ্গেও সাবেক এসবি প্রধানের চাঞ্চল্যকর বক্তব্য।

৫ আগস্ট ২০২৪—বাংলাদেশের রাজনীতিতে নাটকীয় এক পালাবদলের দিন। শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং তার দেশত্যাগের আগে রাষ্ট্রের স্পর্শকাতর গোয়েন্দা তথ্য যাদের টেবিলে আসত, তাদের অন্যতম ছিলেন পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) তৎকালীন প্রধান মনিরুল ইসলাম। সম্প্রতি সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ২০২৩ সালেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সম্ভাব্য সরকার পরিবর্তনের একটি ‘ছক’ সম্পর্কে সতর্ক করার দাবি করেছেন।

মনিরুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চে তিনি একটি বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরি করেছিলেন। সেখানে ২০২৪ সালে একটি নতুন সরকার গঠনের সম্ভাবনা, সম্ভাব্য কাঠামো এবং কারা এতে যুক্ত হতে পারেন—এসব বিষয়ে ধারণা তুলে ধরা হয়েছিল। তার দাবি, ওই রিপোর্টে যাদের নাম ছিল, তাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে উপদেষ্টা, কমিশনের চেয়ারম্যান বা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পান।

সাক্ষাৎকারে মাসুদা ভাট্টির প্রশ্নের জবাবে সাবেক এসবি প্রধান বলেন, রিপোর্টে সম্ভাব্য ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে অনেকে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে আসেন। এমনকি কয়েকজন সংবাদপত্রের সম্পাদকের নামও সেখানে ছিল বলে জানান তিনি।

ভিসা নিষেধাজ্ঞার আগেও ‘আগাম রিপোর্ট’

২০২৩ সালে বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন মনিরুল ইসলাম। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র বা ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে ভিসা নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আসার এক-দুই দিন আগে তিনি এ বিষয়ে একটি রিপোর্ট দিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, পরে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে পুরোনো ওই রিপোর্টের খসড়া উদ্ধার করে মিলিয়ে দেখেন, তাতে উল্লেখ করা তথ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে মিলে গেছে বলে তার মনে হয়েছে।

হাসিনার হাতে সরাসরি রিপোর্ট

সরকার ওই রিপোর্ট পাওয়ার পর কী পদক্ষেপ নিয়েছিল—এমন প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, তিনি মার্চের রিপোর্টটি সরাসরি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর হাতে দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা পুরো রিপোর্টটি পড়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।

মনিরুলের ভাষ্য, প্রায় সাত-আট পৃষ্ঠার ওই রিপোর্টে ‘জাতীয় সরকার’ ধরনের একটি কাঠামোর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। সেখানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বের সম্ভাবনার বিষয়টিও উঠে এসেছিল। তবে তার বয়সের কারণে তিনি সরাসরি নেতৃত্বে নাও থাকতে পারেন—এমন ধারণা থেকে কয়েকজন সম্ভাব্য প্রতিনিধির নামও উল্লেখ করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।

‘ইউনূস নিজেই হতে চাইবেন’

মনিরুল ইসলাম বলেন, রিপোর্ট পড়ার পর শেখ হাসিনা তাকে বলেছিলেন—ড. ইউনূস সম্পর্কে তার ধারণা অনুযায়ী, তিনি ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখবেন না; বরং নিজেই নেতৃত্বে আসতে চাইবেন।

মনিরুলের দাবি, সে সময় তিনি ড. ইউনূসের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত ছিলেন না এবং তার সঙ্গে কখনো সরাসরি কথা বলারও সুযোগ হয়নি। ফলে শেখ হাসিনার মন্তব্য তখন তার কাছে কিছুটা বিস্ময়কর লেগেছিল।

তবে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে ওই বক্তব্য মিলিয়ে তিনি মনে করেছেন, শেখ হাসিনা ড. ইউনূসের রাজনৈতিক ভূমিকার সম্ভাবনাটি আগে থেকেই অনুমান করেছিলেন।

‘নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না’—এমন পূর্বাভাসও ছিল

মনিরুল ইসলাম দাবি করেন, তার রিপোর্টে ২০২৪ সালের নির্বাচনকে ঘিরে সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতার বিষয়টিও ছিল। নির্বাচন ঠেকানোর চেষ্টা হতে পারে—এমন আশঙ্কাও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।

তবে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর সরকারি দল ও গোয়েন্দা সংস্থাসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এক ধরনের আত্মতুষ্টি তৈরি হয়েছিল বলে মনে করেন তিনি।

২৮ অক্টোবরের আন্দোলন থেকে ৫ আগস্টের পথ?

মনিরুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপি-জামায়াতের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সরকার পতনের একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসায় সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি বলে তার দাবি।

তার ভাষ্য, এরপর নির্বাচন হয়ে যাওয়ায় সরকার ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আত্মতুষ্টি তৈরি হয়। আন্দোলন হলেও তা কয়েক বছর পর বা সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে হবে—এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল।

‘ডিপস্টেট’ নিয়ে বিস্তর দাবি

সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কথিত ‘ডিপস্টেট’-এর ভূমিকা নিয়েও বিস্তর বক্তব্য দেন সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা।

তার দাবি, সরকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে এগিয়েছে। প্রচলিত রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন সম্ভব নয়—এমন ধারণা থেকে ছাত্র ও তরুণদের আন্দোলনকে কাজে লাগানোর কৌশল নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ও ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনকে ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। তবে এসব বক্তব্য তার নিজস্ব বিশ্লেষণ ও দাবি—এমন কোনো স্বাধীন প্রমাণ তিনি সাক্ষাৎকারে উপস্থাপন করেছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।

৫ আগস্টে এত দ্রুত রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ল কেন?

এসবি যদি আগেই সরকার পতনের পরিকল্পনার ইঙ্গিত পেয়ে থাকে, তাহলে ৫ আগস্ট এত দ্রুত পরিস্থিতি বদলে গেল কীভাবে—সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির এমন প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেতরেও কথিত ‘ডিপস্টেট’ বা প্রভাবশালী একটি অংশের ভূমিকার দাবি করেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনী একটি শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হওয়ায় সেখানে এমন একটি অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী বা নেটওয়ার্কের প্রভাব ছিল, যা সবসময় সরকারের পক্ষে কাজ করেনি; কখনো সরকারের বিরুদ্ধেও ভূমিকা রেখেছে।

তিনি আরও দাবি করেন, ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন স্তরে ব্যাপক পরিবর্তন হলেও তিন বাহিনীর প্রধানরা বহাল ছিলেন। বিজিবির তৎকালীন মহাপরিচালক সম্পর্কেও একই ধরনের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তিনি।

‘সেনাবাহিনীর একটি অংশ পরিকল্পনার পেছনে ছুরিকাঘাত করেছে’

মনিরুল ইসলামের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দাবিগুলোর একটি হলো—সরকারের আন্দোলন মোকাবিলার পরিকল্পনার পেছনে সেনাবাহিনীর একটি অংশ ‘ছুরিকাঘাত’ করেছে।

তার ভাষ্য, অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি ‘মিনি ডিপস্টেট’ কাজ করত এবং সেটি কথিত মূল ‘ডিপস্টেট’-এর সঙ্গে সমন্বয় করে ভূমিকা রাখত।

তবে মনিরুল ইসলামের এসব বক্তব্য সাক্ষাৎকারে দেওয়া তার নিজস্ব দাবি ও বিশ্লেষণ। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই বা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতিক্রিয়া এই বক্তব্যে পাওয়া যায়নি। ফলে তার দাবিগুলোকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে নয়, বরং একজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তার বক্তব্য হিসেবে দেখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

৫ আগস্টের রাজনৈতিক পালাবদল, ২০২৩ সালের গোয়েন্দা রিপোর্ট, ড. ইউনূসকে ঘিরে তৎকালীন সরকারের মূল্যায়ন এবং কথিত ‘ডিপস্টেট’-এর ভূমিকা নিয়ে মনিরুল ইসলামের এই বক্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অন্দরমহলের নানা প্রশ্ন সামনে এনেছে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।