মঙ্গলবার, ১২ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দুর্নীতির সাম্রাজ্যের পতন?— সোহরাওয়ার্দী থেকে সেহাবের বিদায়, বেরিয়ে আসছে কোটি কোটি টাকার লুটপাটের ভয়ংকর চিত্র

তাবাসসুম স্নেহা
মে ১২, ২০২৬ ১০:১৮ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের আলোচিত ও সমালোচিত নাম ডা. মোহাম্মদ সেহাব উদ্দীন। করোনা মহামারির ভয়াবহ সময়কে পুঁজি করে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে যিনি গড়ে তুলেছিলেন কথিত দুর্নীতি, লুটপাট ও সিন্ডিকেটের এক অদৃশ্য সাম্রাজ্য— অবশেষে সেই সেহাব উদ্দীনের বিদায় ঘণ্টা বেজে উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামীপন্থি চিকিৎসক সংগঠন স্বাচিপের প্রভাব খাটিয়ে বছরের পর বছর বহাল তবিয়তে থেকেছেন তিনি। সরকার পরিবর্তনের পরও থামেনি তার দাপট। বরং বিস্ময়করভাবে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের চেয়ারও বাগিয়ে নেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, স্বাস্থ্য প্রশাসনের উচ্চপর্যায়কে “ম্যানেজ” করেই তিনি এই পদে আসীন হন। এরপর শুরু হয় নতুন অধ্যায়ের বিতর্ক— টেন্ডার কারসাজি, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, আত্মীয়স্বজনকে ব্যবহার করে কেনাকাটার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগে ফের উত্তাল হয়ে ওঠে স্বাস্থ্যখাত।

৩০ কোটি টাকার টেন্ডারে ‘নিজস্ব সিন্ডিকেট’!
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চলতি অর্থবছরে ৩৬টি প্যাকেজে প্রায় ৩০ কোটি টাকার কেনাকাটাকে ঘিরে উঠেছে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ। অভিযোগ অনুযায়ী, দরপত্রের স্পেসিফিকেশন এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ অংশ নিতে না পারে।

মূল্যায়ন কমিটির একাধিক সদস্য নীরবে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, এ ধরনের টেন্ডার অনুমোদন দিলে ভবিষ্যতে দুর্নীতির মামলায় জড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, পরিচালক সেহাব উদ্দীন কমিটির ওপর সরাসরি চাপ প্রয়োগ করেছেন। এমনকি স্বাস্থ্য সচিবের প্রভাব ব্যবহার করে টেন্ডার অনুমোদনের চেষ্টা চালানো হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ভাগিনা-শ্যালক নির্ভর ‘দুর্নীতির নেটওয়ার্ক’
হাসপাতালসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডা. সেহাব উদ্দীনের ঘনিষ্ঠ সিন্ডিকেটে ছিলেন তার ভাগিনা চিকিৎসক বোরহান, শ্যালক জাকারিয়া এবং কয়েকজন প্রভাবশালী ঠিকাদার।

অভিযোগ আছে, ভারী যন্ত্রপাতি কেনা, কেমিক্যাল সরবরাহ, আউটসোর্সিং বিল, চিকিৎসা যন্ত্র মেরামত— সব ক্ষেত্রেই এই সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। সরকারি প্রতিষ্ঠান নেমিউকে পাশ কাটিয়ে নিজের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ারও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।

করোনা হাসপাতালকে বানানো হয়েছিল ‘লুটপাটের স্বর্গরাজ্য’। সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ এসেছে কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালকে ঘিরে। করোনা সংকটের সময় সাধারণ মানুষের জীবন-মৃত্যুর লড়াই চলাকালে সেখানে নাকি চলেছে লাগামহীন অর্থ আত্মসাৎ।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করে আত্মীয়স্বজনের নামে প্রতিষ্ঠান খুলে কোটি কোটি টাকার বিল উত্তোলন করা হয়।

মাত্র ২ কোটি টাকার যন্ত্রপাতিকে ১২ কোটির বেশি দেখানো, মালামাল সরবরাহ ছাড়াই বিল তোলা, নিম্নমানের পণ্য কয়েকগুণ দামে ক্রয়— এমন বিস্ফোরক অভিযোগ বহুবার গণমাধ্যমে এলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এমনকি করোনাকালে চিকিৎসক ও নার্সদের খাবার ও আবাসনের বিল নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই সময় বিতর্কিত ঠিকাদারদের সঙ্গে অতিরিক্ত দামে চুক্তি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়।

তদন্ত থামিয়ে দেওয়ার অভিযোগ-স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একাধিকবার তদন্ত কমিটি গঠন করলেও অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও সংগঠনভিত্তিক লবিংয়ের মাধ্যমে সেসব তদন্ত ধামাচাপা দেওয়া হয়।
ফলে বছরের পর বছর ধরেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন ডা. সেহাব উদ্দীন। অবশেষে অপসারণ, কিন্তু প্রশ্ন একটাই—শুধু বদলি, নাকি বিচারও হবে?

সর্বশেষ অভিযোগ ও অনিয়মের নানা তথ্য সামনে আসার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তড়িঘড়ি করে তাকে সরিয়ে দেয়। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন— কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কি শুধুই বদলি? দুর্নীতির প্রকৃত তদন্ত, সম্পদের হিসাব এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না— এখন সেটিই দেখার বিষয়।

এদিকে হাসপাতালের ঔষধাগার বিভাগের দায়িত্বে থাকা রফিকুল ইসলামকে নিয়েও মিলেছে বিস্ফোরক তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, ওষুধ ক্রয় ও সরবরাহে গড়ে উঠেছিল আরেকটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সেই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিয়ে আসছে পরবর্তী অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।