ঢাকার কর অঞ্চল-৩ এর অন্দরমহলে এখন ফিসফাস, ক্ষোভ আর বিস্ময়ের কেন্দ্রবিন্দু এক নাম— মো: জুলহাস উদ্দিন আহমেদ। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নিম্নপদে চাকরি করা এই সরকারি কর্মচারীকে ঘিরে উঠে এসেছে এমন সব অভিযোগ, যা রীতিমতো নাড়া দিয়েছে কর প্রশাসনের ভেতরের বাস্তবতাকে। অভিযোগের তালিকায় রয়েছে ভুয়া ঠিকানায় চাকরি নেওয়া, জাল কাগজপত্র ব্যবহার, পুলিশ ভেরিফিকেশন ম্যানেজ, কর ব্যবস্থায় অনিয়ম, এমনকি নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তোলার মতো গুরুতর বিষয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৯৩ সালের ২৩ মে কর বিভাগে নৈশ প্রহরী হিসেবে চাকরিজীবন শুরু করেন জুলহাস উদ্দিন। এরপর ২০০০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর পদোন্নতি পেয়ে অফিস সহায়ক (পিয়ন) হন। দীর্ঘ ২৫ বছর একই পদে থাকার পর ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দ্বিতীয় দফায় পদোন্নতি পেয়ে “অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক” পদে উন্নীত হন। বর্তমানে তিনি কর অঞ্চল-৩ এর সার্কেল-৫৯, পুরানা পল্টনে কর্মরত।
সরকারি নথি বলছে, তার বর্তমান মোট মাসিক বেতন মাত্র ২২ হাজার ৪৯০ টাকা। অথচ এই সীমিত আয়ের কর্মচারীকে ঘিরেই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে কোটি টাকার সম্পদের রহস্য।
ভুয়া ঠিকানায় চাকরি, তিন স্থায়ী ঠিকানার রহস্য।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদকের হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী, চাকরিতে যোগদানের সময় জুলহাস উদ্দিন নিজেকে মানিকগঞ্জ জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে উপস্থাপন করেন। অভিযোগ রয়েছে, জাল কাগজপত্র ব্যবহার করেই তিনি ওই পরিচয়ে সরকারি চাকরি বাগিয়ে নেন। আরও ভয়াবহ অভিযোগ— চাকরি স্থায়ীকরণের সময় পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্টও ঘুষের মাধ্যমে নিজেদের অনুকূলে নেওয়া হয়।
কিন্তু অনুসন্ধানে মানিকগঞ্জে তার কোনো স্থায়ী ঠিকানার অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। বরং জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করে দেখা গেছে, তার প্রকৃত ঠিকানা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর এলাকায়। তার পূর্বের এনআইডি নম্বর ১৯৭৩২৬৯৩৬২৫৬৮৮৭২৯ এবং বর্তমান স্মার্টকার্ড নম্বর ৬৪০০৭১৫১২১ অনুযায়ী ওই তথ্যের সত্যতা মিলেছে।
এতেই শেষ নয়। টিআইএন সার্টিফিকেট ঘেঁটে ঢাকাতেও পাওয়া গেছে আরেকটি স্থায়ী ঠিকানার সন্ধান। অর্থাৎ একজন সরকারি কর্মচারীর তিনটি পৃথক স্থায়ী ঠিকানা— যা নিয়ে এখন উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। প্রশাসনের ভেতরেও এ নিয়ে চলছে চাপা আলোচনা।
আয়কর ব্যবস্থায়ও ‘বিশেষ সুবিধা’ নেওয়ার অভিযোগ
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিলের নির্দিষ্ট নিয়ম থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, জুলহাস উদ্দিন বছরের পর বছর সেই নিয়মকে পাশ কাটিয়ে গেছেন।
সাধারণত ঢাকায় কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীরা অনলাইনে নতুন টিআইএন খুললে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর অঞ্চল-৪ এর আওতায় অন্তর্ভুক্ত হন। কিন্তু নিজের কর্মস্থল কর অঞ্চল-৩ হওয়ায় জুলহাস উদ্দিন একই অঞ্চলের সার্কেল-৬২ থেকেই টিআইএন গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সব নিয়ম যেন তার জন্য আলাদা। বছরের পর বছর একই দপ্তরে থেকে তিনি এমন এক প্রভাববলয় গড়ে তুলেছেন, যেখানে নিয়ম ভাঙাই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
এসব বিষয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হলে জুলহাস উদ্দিন নিজেই স্বীকার করেন, আমার ভুল হয়েছে।
নৈশ প্রহরী থেকে ‘কোটি টাকার সাম্রাজ্য’-
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরও বিস্ফোরক তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকার খিলগাঁও দক্ষিণ বনশ্রী মেইন রোডের এইচ ব্লকে নিকট আত্মীয়ের নামে কোটি টাকার ফ্ল্যাট কিনেছেন তিনি।
শুধু ঢাকাই নয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুলতানপুর এলাকায় নিজের ও ভাইদের নামে গড়ে তুলেছেন একাধিক রাজকীয় বাড়ি। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িগুলোতে রয়েছে অভিজাত ফার্নিচার, আধুনিক ইন্টেরিয়র ও বিলাসবহুল সাজসজ্জা। এছাড়া আত্মীয়-স্বজনের নামেও বিপুল পরিমাণ জমি কেনার তথ্য পেয়েছে প্রতিবেদক।
পরিবারের আর্থিক অবস্থাও তৈরি করেছে নতুন প্রশ্ন। সাত ভাইয়ের মধ্যে একজনকে পাঠানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে, আরেক ভাই অবস্থান করছেন সৌদি আরবে। ছেলে-মেয়েদের ব্যয়বহুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার তথ্যও মিলেছে। তার ছেলে দেশের বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান East West University-তে পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে London Metropolitan
University-তে অধ্যয়নরত।
অথচ নিজের মুখেই তিনি স্বীকার করেছেন, দীর্ঘদিন তার মাসিক বেতন ছিল মাত্র ১৬ হাজার টাকার মতো। ফলে প্রশ্ন উঠেছে— এই বিপুল সম্পদের উৎস কোথায়?
প্রশ্নের মুখে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া-প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়— একজন নৈশ প্রহরী ও পরে পিয়ন পদে চাকরি করা ব্যক্তি কীভাবে এত বিপুল সম্পদের মালিক হলেন। কিন্তু কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় জুলহাস উদ্দিন বলেন, আপনারা যা পারেন নিউজ করেন!
লাখ লাখ টাকার জীবনযাপন, বিদেশে উচ্চশিক্ষা, জমি-ফ্ল্যাট কেনাসহ বিপুল ব্যয়ের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি প্রশ্ন এড়িয়ে যান।
‘দানবীর’ পরিচয়ের আড়ালেও নানা প্রশ্ন ঘুরপাক
খাচ্ছে । অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুলতানপুর এলাকায় বিভিন্ন খেলাধুলা, স্কুল অনুষ্ঠান ও সামাজিক আয়োজনে নিয়মিত অনুদান দিয়ে থাকেন জুলহাস উদ্দিন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাকে বিশেষ অতিথি হিসেবেও দেখা যায়। উপহার সামগ্রী ও নগদ অর্থ বিতরণ করতে দেখা গেছে তাকে প্রকাশ্যেই।
স্থানীয়দের প্রশ্ন— একজন নিম্নপদস্থ সরকারি কর্মচারীর পক্ষে এত বিপুল অর্থ ব্যয় করা সম্ভব কীভাবে?
সচেতন মহলের দাবি— নিরপেক্ষ তদন্ত হোক
সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শুধু একজন কর্মচারীর অনিয়মের অভিযোগ নয়; বরং সরকারি নিয়োগ, পুলিশ ভেরিফিকেশন, কর প্রশাসন ও সম্পদ গোপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
সচেতন মহলের দাবি, মো: জুলহাস উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে তার সম্পদের উৎস, একাধিক স্থায়ী ঠিকানা, টিআইএন সংক্রান্ত অনিয়ম এবং চাকরির নথিপত্র পুনরায় যাচাইয়ের দাবিও উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, রাষ্ট্রের ভেতরে থেকেই যদি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে বছরের পর বছর অনিয়ম ও প্রভাবের সাম্রাজ্য গড়ে তোলা সম্ভব হয়, তবে প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও গভীর সংকটে পড়বে।
