শিশুসহ ১২ জনের দু’দিন ধরে শূন্যরেখায় মানবেতর জীবন, অনিশ্চয়তায় তিন পরিবার। ছবি সমতল মাতৃভূমি
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে পুশইনের চেষ্টা করা নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১২ জন সীমান্তের শূন্যরেখায় টানা দু’দিন ধরে মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। প্রখর রোদ, ভ্যাপসা গরম আর খোলা আকাশের নিচে পাটক্ষেতের মধ্যে শিশু সন্তানদের নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় পার করছেন তারা।
এ ঘটনায় শনিবার (১৩ জুন) দৌলতপুর সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর মধ্যে অনুষ্ঠিত পতাকা বৈঠকও কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে। ফলে সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থানরত তিন পরিবারের সদস্যরা কার্যত কুল-কিনারাহীন অবস্থায় পড়েছেন।
পুশইন চেষ্টার ঘটনায় শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের বিলগাতুয়া সীমান্তের ১৫০/৩-এস সীমান্ত পিলার সংলগ্ন নোম্যান্সল্যান্ডে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিএসএফের পক্ষে ছয় সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার করিমপুর থানার ১১ বিএসএফ কমান্ডেন্টের অধীনস্থ রানীনগর বিএসএফ ক্যাম্পের কমান্ডার এসি সুনীল কুমার যাদব। অপরদিকে বিজিবির পক্ষে ছয় সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন কুষ্টিয়া ব্যাটালিয়ন (৪৭ বিজিবি)-এর সহকারী পরিচালক মো. নুরুল হুদা।
সকাল ১০টা পর্যন্ত চলা ওই বৈঠকে বিএসএফ দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে ১২ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের অভিযোগ অস্বীকার করে। একই সঙ্গে শূন্যরেখায় অবস্থানরত শিশু, নারী ও পুরুষসহ ১২ জনকে নিজেদের হেফাজতে ফিরিয়ে নিতেও অস্বীকৃতি জানায়। এ সময় বিজিবি প্রতিবাদ জানালে বিএসএফ বিষয়টি তদন্ত ও যাচাইয়ের জন্য সময় চেয়ে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত জানানোর কথা জানায়। ফলে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয় পতাকা বৈঠক।
বিজিবি সূত্র জানায়, বিএসএফের পক্ষ থেকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত শিশুসহ ওই ১২ জনকে সীমান্তের শূন্যরেখাতেই অবস্থান করতে হবে বলে জানানো হয়েছে। এদিকে সীমান্ত এলাকায় বিজিবির পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকেও সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা গেছে। সীমান্তে বাড়ানো হয়েছে বিজিবির জনবল।
এর আগে শুক্রবার (১২ জুন) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ১৪৯ নম্বর সীমান্ত পিলার সংলগ্ন দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের চরবিলগাতুয়া সীমান্ত এলাকা দিয়ে শিশু, নারী ও পুরুষসহ ১২ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বিজিবি ও স্থানীয় জনসাধারণের প্রতিরোধ এবং তৎপরতায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
বিজিবি ও স্থানীয়দের বাধার মুখে ১২ জনকে ১৪৮/৩-এস সীমান্ত পিলার সংলগ্ন প্রাগপুর সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে প্রায় ৫০ গজ ভারতের অভ্যন্তরে পাঠিয়ে দেওয়া হলে তারা সেখানে অবস্থান নেয়। বর্তমানে তারা সেখানেই রয়েছেন। তবে তারা নিজেদের বাংলাদেশি নাগরিক বলে দাবি করেছেন।
বাংলাদেশি দাবি করা তিন পরিবারের ১২ জনের মধ্যে রয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার বাথানপাড়া গ্রামের মৃত ওয়াসেদ আলীর ছেলে উজির আলী (৫০), তার স্ত্রী জয়নুর বেগম (৩৫), ছেলে শিহাদ (১৭), ইনজামুল (৮) এবং আড়াই বছরের শিশু সামাদ। এছাড়াও সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার রফিকুল গাজীর পরিবারের তিন সদস্য এবং খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আফরোজা খাতুনের পরিবারের চার সদস্য রয়েছেন। তাদের ভারতের কেরালা রাজ্য থেকে আটক করা হয়। পরে বিএসএফ তাদের দৌলতপুরের চরবিলগাতুয়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে।
এ ঘটনায় শুক্রবার বিকেল ৪টায় বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও তা অনুষ্ঠিত না হওয়ায় ১২ জনকে সীমান্ত এলাকার পাটক্ষেতের ভেতর খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হয়।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া ব্যাটালিয়ন (৪৭ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি বলেন, “শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় বিলগাতুয়া সীমান্তে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে বিএসএফ কুষ্টিয়া সীমান্ত দিয়ে পুশইনের বিষয়টি অস্বীকার করেছে এবং বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য সময় চেয়েছে। তবে সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
সীমান্তে অনিশ্চয়তার প্রহর
দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বৈঠকেও সমাধান না আসায় শিশু, নারী ও পুরুষসহ ১২ জনের ভাগ্য এখনো অনিশ্চিত। খোলা আকাশের নিচে শূন্যরেখায় মানবেতর জীবন কাটানো এসব পরিবারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দুই দেশের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।
