মধ্যরাতে জলাবদ্ধ সড়কে নেমে ড্রেন পরিষ্কারের তদারকি, ভোরে অফিসে হাজিরা পরিদর্শন—ময়মনসিংহে দায়িত্বশীলতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন মসিক প্রশাসক। ফাইল ছবি: সংগৃহীত
মাত্র এক পশলা বৃষ্টিতেই বরাবরের মতো থমকে গেছে ব্রহ্মপুত্র পাড়ের ঐতিহ্যবাহী শহর ময়মনসিংহ। শনিবার রাতের আকস্মিক মাঝারি বর্ষণে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হাঁটুজলে তলিয়ে যায়। পানিবন্দি নগরবাসীর এই দৃশ্য যেন দীর্ঘদিনের এক চিরচেনা নিয়তির গল্প। তবে সেই চেনা দুর্ভোগের মাঝেও এবার দেখা গেল এক ব্যতিক্রমী, স্বস্তিদায়ক ও অনুপ্রেরণামূলক দৃশ্য—যা জনপ্রশাসন ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় দায়িত্ববোধের এক অনন্য নজির হয়ে উঠেছে।
গভীর রাতে যখন অধিকাংশ মানুষ ঘরের ভেতরে বন্দি, ঠিক তখনই পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে জলমগ্ন সড়কে নেমে পড়েন ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের (মসিক) বর্তমান প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন। শুধু মধ্যরাতের মাঠপর্যায়ের তদারকিই নয়, পরদিন ভোরেই দাপ্তরিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে তাঁর আকস্মিক অফিস পরিদর্শন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে।
মধ্যরাতের জলমগ্ন সড়কে ‘ত্রাতা’র ভূমিকায় প্রশাসক
শনিবার রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টায় শুরু হওয়া বৃষ্টি চলে প্রায় রাত ১২টা পর্যন্ত। বৃষ্টির তোড়ে মুহূর্তেই শহরের নিচু এলাকা ও প্রধান সড়কগুলো জলমগ্ন হয়ে পড়ে। কিন্তু বৃষ্টি পুরোপুরি থামার আগেই চরম বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিয়ে রাস্তায় উপস্থিত হন প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন।
তিনি শহরের বিভিন্ন প্লাবিত সড়ক ঘুরে ঘুরে প্রায় হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে জলাবদ্ধতার মূল কারণগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। তাৎক্ষণিকভাবে ড্রেন পরিষ্কারের কাজ শুরু করিয়ে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে মাঠপর্যায়ের তদারকি করেন। গভীর রাত পর্যন্ত তাঁর এই নিরলস কর্মতৎপরতার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা সাধারণ নাগরিক মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়।
স্থানীয় প্রবীণ নাগরিকদের ভাষ্য, ময়মনসিংহের ইতিহাসে এর আগে কোনো শীর্ষ কর্মকর্তাকে এভাবে মধ্যরাতে ড্রেন পরিষ্কারের তদারকি করতে নিজে রাস্তায় নামতে দেখিনি। সাধারণত বড় কর্মকর্তারা কার্যালয়ে বসেই নির্দেশ দেন। কিন্তু বর্তমান প্রশাসক নিজে মাঠে নেমে যেভাবে কাজ করছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
মাঠের পর ভোরে অফিস তদারকিতেও কঠোর অবস্থান
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাই নয়, সিটি কর্পোরেশনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন এই প্রশাসক।
সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিতকরণ:
প্রতিদিন ভোরবেলা তিনি কর্পোরেশনের বিভিন্ন দপ্তরে হাজির হয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি পরীক্ষা করছেন এবং প্রতিটি টেবিলে নির্ধারিত সময়ে দায়িত্ব পালন হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করছেন।
তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান :
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত সমস্যা রয়েছে কিনা, সে বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছেন এবং কোনো সংকট থাকলে তা দূর করতে প্রয়োজনীয় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন স্পষ্টবাদী মানুষ হিসেবে মো. রুকুনোজ্জামান রোকনের পরিচয় কথায় নয়, বরং তাঁর কর্মেই প্রতিফলিত হচ্ছে। নিজেকে জনগণের একজন ‘সেবক’ মনে করেই তিনি এই দ্বিমুখী তদারকি ব্যবস্থা সচল রেখেছেন।
দীর্ঘমেয়াদি সংকটের ‘শতভাগ সমাধান’-এর আশ্বাস
ময়মনসিংহের জলাবদ্ধতার সমস্যা দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অবহেলা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফল। প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন নগরবাসীকে কোনো সস্তা আশ্বাস না দিয়ে বাস্তবতার নিরিখে কথা বলেছেন।
তিনি জানিয়েছেন, জলাবদ্ধতার এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সময় ও সমন্বিত উদ্যোগ। তবে সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানে সিটি কর্পোরেশন শতভাগ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। নাগরিকদের ভোগান্তি কমাতে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে ড্রেনেজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জাতীয় জনপ্রশাসনে এক অনন্য শিক্ষার বার্তা
ময়মনসিংহ সিটি প্রশাসকের এই উদ্যোগ শুধু একটি শহরের ড্রেন পরিষ্কার বা হাজিরা খাতা দেখার গল্প নয়; এটি দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বার্তা।
প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন দেখিয়ে দিয়েছেন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের আরাম ছেড়ে জনগণের দুর্ভোগের সময় পাশে দাঁড়ানো এবং একই সঙ্গে কঠোরভাবে দাপ্তরিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার মাধ্যমে কীভাবে মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করা যায়।
সততা, স্পষ্টবাদিতা এবং মাঠপর্যায়ের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে একজন শীর্ষ কর্মকর্তা কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন, তার জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যদি ময়মনসিংহের এই কর্মসংস্কৃতি থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের জনগণের সেবায় আরও নিবেদিত করেন, তবে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার চিত্র দ্রুত বদলে যেতে পারে। একজন নেতার সদিচ্ছা ও মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তা যে পুরো প্রশাসনিক টিমকে উজ্জীবিত করতে পারে, মো. রুকুনোজ্জামান রোকনের এই তাঁরই অকাট্য প্রমাণ।
