বৃহস্পতিবার, ৩০শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

গণপূর্ত নিজস্ব কাঠের কারখানায় নীরবতা, ঠিকাদারদের রঙিন রাজত্ব! নেই কোনো জবাবদিহি

মো. কামরুল হাসান সোহাগ
জুলাই ২৯, ২০২৬ ১১:৪০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

গণপূর্তের কাঠের কারখানায় তালা, ঠিকাদারদের সঙ্গে ‘অদৃশ্য প্রেমে’ সরকারি আসবাব কেনা নিয়ে নতুন বিতর্ক।বিশেষ অনুসন্ধান প্রতিবেদন। ফাইল ফটো

সাম্প্রতিক গণপূর্ত কাঠের কারখানা নিয়ে বিতর্ক থামছেই না। নিজস্ব কারখানা অচল, ঠিকাদার-নির্ভর আসবাব কেনে গণপূর্ত।

কাঠের কারখানা নামে গণপূর্ত অধিদপ্তরের রয়েছে আলাদা একটি ইউনিট। সরকারি দপ্তর থেকে শুরু করে সংস্থা, হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, অফিস-আদালতসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আসবাবপত্র সরবরাহের কাজের জন্যই গড়ে তোলা হয় এই ইউনিট। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ প্রকৌশলী—সবই আছে কাঠের কারখানার। কিন্তু প্রায় এক দশক ধরে সেখানে কোনো উৎপাদন কার্যক্রম নেই।

এই সময়ে সরকারি প্রকল্পের আসবাবপত্রের নকশা, স্পেসিফিকেশন, ব্যয় প্রাক্কলন থেকে শুরু করে উৎপাদন ও সরবরাহ—সবই হচ্ছে গুটি কয়েক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এখানে যখন যে প্রকৌশলী দায়িত্বে গেছেন, তারা ইউনিটটিকে সচল বা কার্যকর না করে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব সিন্ডিকেট। ফলে দিনে দিনে কতিপয় ফার্নিচার ব্যবসায়ীর হাতে কার্যত জিম্মি হয়ে পড়ছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের এই বিশেষায়িত ইউনিট।

কারখানা আছে, কর্মকর্তা আছেন—উৎপাদন নেই

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর মিরপুর-৬ নম্বরে অবস্থিত গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম কাঠ কারখানা উপবিভাগে এখনো পৃথক প্রশাসনিক ও প্রকৌশল কাঠামো বহাল রয়েছে। সেখানে একজন নির্বাহী প্রকৌশলী, একজন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী, দুইজন সহকারী প্রকৌশলী এবং দুইজন উপসহকারী প্রকৌশলী কর্মরত থাকলেও রহস্যজনকভাবে দীর্ঘদিন ধরে কোনো উৎপাদন হচ্ছে না।

জানা গেছে, পাকিস্তান আমলে সরকারি দপ্তর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার জন্য উন্নতমানের কাঠের আসবাবপত্র তৈরির উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত এই কারখানায় একসময় প্রায় ১,২০০ শ্রমিক কাজ করতেন। সরকারি ভবনের দরজা-জানালা, চেয়ার-টেবিল, আলমারি, ক্যাবিনেটসহ বিভিন্ন কাঠজাত সামগ্রী এখানেই তৈরি হতো। পরে আধুনিক যন্ত্রপাতিও সংযোজন করা হয়। তবে প্রায় এক দশক আগে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে ধীরে ধীরে সব কাজ চলে যায় বেসরকারি ঠিকাদারদের হাতে। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এই কারখানা চালুর আলোচনা উঠলেও তা আর বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।

ঠিকাদারনির্ভর পুরো প্রক্রিয়া

সূত্রগুলো বলছে, উৎপাদন বন্ধ থাকায় সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র তৈরির পরিবর্তে প্রতিটি কাজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হচ্ছে। শুধু উৎপাদনই নয়, নকশা প্রণয়ন, স্পেসিফিকেশন তৈরি এবং ব্যয় প্রাক্কলনের মতো কারিগরি কাজও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত এক যুগে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে আসবাবপত্র সরবরাহ ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কাজ ঘুরেফিরে পেয়েছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে প্যারাডাইম ফার্নিচার লিমিটেড, হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড, লিগ্যাসি ফার্নিচার লিমিটেড, নাদিয়া ফার্নিচার লিমিটেড, পারটেক্স ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, অটবি লিমিটেড, আখতার ফার্নিচার লিমিটেড এবং ফার্নিচার কনসেপ্ট অ্যান্ড ইন্টেরিয়র লিমিটেড।

তদন্তের পরও বিতর্ক থামেনি

সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গণপূর্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম প্যারাডাইমের ওপর চড়াও হয়ে তদন্ত শুরু করেন। বর্তমানে সব নথিপত্র মাঠ পর্যায় থেকে সংগ্রহ করে সংস্থাপন শাখায় সংরক্ষণ করা হয়েছে।

এরই মধ্যে প্যারাডাইমের সঙ্গে সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরীর সখ্য গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পরে তার মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠানটি আবারও সচিবালয়ে কাজ পেতে শুরু করে। বর্তমানে গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুরের কার্যালয়ের সাজসজ্জার কাজও করছে প্রতিষ্ঠানটি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরী বলেন, কাঠের কারখানার কাজের সঙ্গে আমার সংশ্লিষ্টতা নেই। আমি বগুড়া থেকে গত বছরের ডিসেম্বরে বর্তমান কর্মস্থলে যোগদান করেছি। কাজেই সচিব আগে কী করেছেন তা আমার জানা নেই।

নতুন প্রতিষ্ঠানের উত্থান

জানা গেছে, গত কয়েক বছরে কাঠের কারখানার সিন্ডিকেটে যুক্ত হয়েছে ফার্নিচার কনসেপ্ট নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান। নামে ও মানে শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের কাতারে না থাকলেও রহস্যজনকভাবে তারা বিপুল পরিমাণ আসবাবপত্রের কাজ করে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের কারিগরি তথ্যের ভিত্তিতেই আসবাবপত্রের নকশা ও স্পেসিফিকেশন প্রস্তুত করা হয়। পরে একই ধরনের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেই সেই আসবাবপত্র কেনা হয়।

সাবেক কর্মকর্তাদের প্রশ্ন

গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, নিজস্ব কারখানাটি সচল থাকলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় উৎপাদন করা সম্ভব ছিল। এতে সরকারের ব্যয় কমার পাশাপাশি মান নিয়ন্ত্রণও সহজ হতো। কিন্তু উৎপাদন বন্ধ রেখে পুরো প্রক্রিয়া ঠিকাদারনির্ভর করায় বিশেষায়িত এই ইউনিটের প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

দরপত্রেও অনিয়মের অভিযোগ

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, আসবাবপত্র কেনার ক্ষেত্রে বিধিবহির্ভূতভাবে একের পর এক দরপত্র পরিচালিত হয়েছে। যেসব ক্রয় ‘গুডস’ ক্যাটাগরিতে হওয়ার কথা, সেগুলোর কিছু ‘ওয়ার্কস’ ক্যাটাগরিতে আহ্বান করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া কোথাও অভিজ্ঞতার শর্ত উপেক্ষা, কোথাও প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই প্যাকেজ পরিবর্তন, কোথাও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি গঠনের নিয়ম না মানা, আবার বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলন, পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়া এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগও উঠেছে।

নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য

গণপূর্ত (ই/এম) জোনের কাঠের কারখানা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জোবায়ের বিন হায়দার বলেন, যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে, কিন্তু জনবল না থাকায় তা চালু করা যায়নি। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বছরের নভেম্বরে জনবল কাঠামোর প্রস্তাব তৈরি করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদন হলে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল পাওয়া যাবে এবং কারখানাটি সচল করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, ড্রয়িং, ডিজাইন বা স্পেসিফিকেশনের কাজ ঠিকাদারদের দিয়ে করানো হয় না। এসব কাজ বিভাগের কর্মকর্তারাই সম্পন্ন করেন। শুধু বাজারদর যাচাইয়ের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কোটেশন নেওয়া হয়। এই খাতে কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম হলেও আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৮টি কোম্পানিকে কাজ দিয়েছি।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন কল গ্রহণ করেননি।

বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে……….

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ