জাল লাইসেন্সে চাকরি, নিয়োগ-বদলির বাণিজ্য, ঢাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, গ্রামে রাজপ্রাসাদসম ডুপ্লেক্স, সাময়িক বরখাস্তের পর দুর্নীতির তদন্তে ফেঁসে যেতে পারেন ফায়ার সার্ভিসের গাড়িচালক মো. সাখাওয়াত হোসেন। ছবি : সমতল মাতৃভূমি
এ যেন সিনেমার গল্প নয়, বাস্তবের এক বিস্ময়কর উত্থান। বরিশালের উজিরপুরের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ছেলে, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ও সরকারি গাড়িচালক মো. সাখাওয়াত হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স ও শিক্ষা সনদ ব্যবহার করে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। সরকারি গাড়ি চালালেও ব্যক্তিগত জীবনে ব্যবহার করেন ল্যান্ড ক্রুজার ও প্রাডোর মতো বিলাসবহুল গাড়ি।
অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদের সাম্রাজ্য। বছিলার গার্ডেন সিটিতে প্রায় দুই কোটি টাকার ৩ হাজার ৫০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট, শেওড়াপাড়ায় কোটি টাকার আরেকটি ফ্ল্যাট, বরিশালে জমি, গ্রামের বাড়িতে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ডুপ্লেক্স বাগানবাড়ি—সব মিলিয়ে তার সম্পদের পরিমাণ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। এসব সম্পদের ভিডিও ও তথ্যও বিভিন্ন গণমাধ্যমের সামনে এসেছে।এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে।
বর্তমান ফায়ার সার্ভিস মহাপরিচালক দুর্নীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করায় এবার পরিস্থিতি বদলেছে। অভিযোগ রয়েছে, অতীতে নানা প্রভাব খাটিয়ে রক্ষা পেলেও এখন তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, নিয়োগ-বাণিজ্য ও অন্যান্য অনিয়মের তদন্ত চলছে। ইতোমধ্যে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, প্রাথমিক অনুসন্ধানেই তার একাধিক বাড়ি ও সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে চাকরি হারানোর পাশাপাশি দুর্নীতির মামলারও মুখোমুখি হতে পারেন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে ফায়ার সার্ভিসে চাকরি ও বদলির নামে দালালি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন সাখাওয়াত। তার পেছনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সাবেক মুখ্যসচিব আবদুস সোবহান শিকদারের প্রভাব কাজ করেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সহকর্মীদের দাবি, ওই প্রভাবকে কাজে লাগিয়েই তিনি ফায়ার সার্ভিসের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন এবং দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে অপ্রতিরোধ্য করে তোলেন।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স জমা দিয়ে চাকরিতে প্রবেশের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০০৭ সালে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। এক বছরের বেতন কর্তন ও তিরস্কারের শাস্তিও দেওয়া হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে আর কার্যকর ব্যবস্থা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, উজিরপুর উপজেলার কেশবকাঠি গ্রামে প্রায় দুই বিঘা জমির ওপর নির্মাণাধীন ডুপ্লেক্স ভবনটি দেখতে অনেকটা রাজপ্রাসাদের মতো। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, টাকার বিনিময়ে বহু মানুষকে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি প্রভাব বিস্তার করেছেন।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, বরিশাল শহরের আলেকান্দা, চৌমাথাসহ বিভিন্ন এলাকায় তার নামে মূল্যবান জমি রয়েছে। ঢাকার বছিলা গার্ডেন সিটিতে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, শেওড়াপাড়ায় আরেকটি ফ্ল্যাট এবং ডেমরার একটি আবাসন প্রকল্পেও বিনিয়োগের তথ্য মিলেছে। অভিযোগ রয়েছে, তদন্তের খবর পেয়ে সম্প্রতি কয়েকটি সম্পদ কৌশলে বিক্রিও করেছেন তিনি।
ফায়ার সার্ভিসের বর্তমান মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বলেছেন, সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে নিয়োগ-বাণিজ্য, শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অন্যান্য অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি কাজ করছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরই মধ্যে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলা এড়িয়ে চলছেন।
