শুক্রবার, ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিমানের সেই শাহজাহানের ক্ষমতার জোর কোথায়? একই স্টেশনে বহাল স্ত্রী, দুজনের বিরুদ্ধেই অভিযোগের পাহাড়

স্টাফ রিপোর্টার
সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬ ১১:২৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বিমানের কুয়েত স্টেশন ম্যানেজার মো. শাহজাহান

অভিযোগের পর অভিযোগ। একাধিক দফায় তদন্তও হয়েছে। উঠেছে মানব পাচার, অতিরিক্ত ব্যাগেজের নামে অনিয়ম, সরকারি ফি ও রসিদ ছাড়াই লাগেজ পার করে দেওয়াসহ গুরুতর নানা অভিযোগ। এর পরও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কুয়েত স্টেশনের বিতর্কিত ও আলোচিত স্টেশন ম্যানেজার মো. শাহজাহান বহাল রয়েছেন স্বপদে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও অদৃশ্য ‘ক্ষমতার প্রভাবের’ কারণে তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। সর্বশেষ সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে স্ট্যান্ড রিলিজ ও মুভমেন্ট অর্ডার ঘিরে। বুধবার তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ ও মুভমেন্ট অর্ডার দেওয়ার ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই তা বাতিল করা হয়। কোনো স্পষ্ট কারণও জানানো হয়নি। উলটো অভিযোগের মুখে থাকা শাহজাহানকে কুয়েত স্টেশনেই বহাল রাখা হয়েছে।

শাহজাহানের বিরুদ্ধে মানব পাচার, অতিরিক্ত ব্যাগেজের নামে অনিয়ম, সরকারি ফি ও রসিদ ছাড়াই লাগেজ পার করে দেওয়াসহ গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই তাকে সরানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

একই ঘটনায় বিমানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের প্রশ্ন—নানা অভিযোগের ভিত্তিতে একজন কর্মকর্তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হলো, আবার মাত্র এক দিনের ব্যবধানে সেই সিদ্ধান্ত কেন পরিবর্তন করা হলো? এর নেপথ্যে কোনো অদৃশ্য প্রভাব কাজ করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, কারো বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ থাকার পর তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে আবার আগের পদে পুনর্বহাল করা হলে তা স্পষ্টতই ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির শামিল। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। অবশ্যই দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো অদৃশ্য ক্ষমতার প্রভাবে স্ট্যান্ড রিলিজের আদেশ পরিবর্তন করা হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ মহাব্যবস্থাপক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মহিউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, এটি মূলত প্রশাসনিক বিষয়। বিমানের নির্দিষ্ট প্রয়োজন অনুযায়ী কাউকে কোনো দায়িত্বে রাখা বা সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ম্যানেজমেন্ট মনে করেছে, আপাতত তাকে সেখানেই রাখা প্রয়োজন। সে কারণেই হয়তো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়েছে।

২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আদেশ বাতিল

প্রাপ্ত তথ্যমতে, বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বিমানের কুয়েত স্টেশনের ম্যানেজার মো. শাহজাহান (পি-৩৬৪৮৯)-কে স্ট্যান্ড রিলিজ ও মুভমেন্ট অর্ডার দেওয়া হয়। কিন্তু পরদিন বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) কোনো স্পষ্ট কারণ না জানিয়েই সেই আদেশ বাতিল করে তাকে কুয়েত স্টেশনেই বহাল রাখা হয়েছে।

গণমাধ্যমের হাতে আসা বিমানের গ্রাউন্ড সার্ভিসেসের ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ফারহানা আক্তারের স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক চিঠিতে (স্মারক নং-৩০.৩৪.০০০০.০১৯.১৪.০০৫.২৬) বৃহস্পতিবার আগের আদেশ প্রত্যাহারের কথা জানানো হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কুয়েতে বিমানের স্টেশন ম্যানেজার মো. শাহজাহানের বুধবার ইস্যুকৃত মুভমেন্ট/রিলিজ অর্ডারটি বাতিল করা হয়েছে।

মাত্র এক দিনের ব্যবধানে একই কর্মকর্তাকে নিয়ে বিমানের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের এমন নাটকীয় পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রশ্ন, যদি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুতর হয়ে থাকে, তাহলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কেন স্ট্যান্ড রিলিজ বাতিল করা হলো?

১৪ জনের মধ্যে ১২ জনের ব্যাগেজেই অনিয়ম

কুয়েত থেকে ঢাকাগামী বিজি-৩৪৪ ফ্লাইটে বিমানের নিরাপত্তা বিভাগের ডিজিএমের ঝটিকা তল্লাশিতে কুয়েত স্টেশনের ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অনিয়মের চিত্র উঠে আসে।

তদন্তে তল্লাশি করা ১৪ জন যাত্রীর মধ্যে ১২ জনের কাছেই বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত ব্যাগেজ পাওয়া যায়। অভিযোগ রয়েছে, এসব অতিরিক্ত ব্যাগেজের বিপরীতে নিয়ম অনুযায়ী সরকারি ফি আদায় করা হয়নি। দেওয়া হয়নি কোনো সরকারি রসিদও।

অতিরিক্ত ব্যাগেজের নামে যে অর্থ আদায় হয়, তা সরকারি রাজস্বে জমা না পড়ে অন্য পথে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। বিষয়টি শুধু আর্থিক অনিয়মের অভিযোগেই সীমাবদ্ধ নয়; উড়োজাহাজের নির্ধারিত ওজনসীমা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার দিক থেকেও বিষয়টি গুরুতর বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি ফ্লাইটে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত ব্যাগেজ কীভাবে নিয়মিত প্রক্রিয়ার বাইরে পার হলো—এ প্রশ্নেরও স্পষ্ট জবাব মেলেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।

একই স্টেশনে স্বামী-স্ত্রী, প্রশ্ন পদায়ন নিয়েও

কুয়েত স্টেশন ঘিরে আরেকটি বিতর্ক শাহজাহান ও তার স্ত্রী শামিমা পারভীনের একই স্টেশনে পদায়নকে কেন্দ্র করে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রভাব খাটিয়ে তারা দুজনই একই বিদেশি স্টেশনে পদায়ন ধরে রেখেছেন।

একই স্টেশনে স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্ব পালন নিয়ে বিমানের ভেতরে আগে থেকেই নানা আলোচনা থাকলেও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এরই মধ্যে স্টেশনটির ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসায় স্বামী-স্ত্রীর একই স্টেশনে দায়িত্ব পালন নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

তদন্ত নিয়েও ‘দায়সারা’ অভিযোগ

স্বামী-স্ত্রী একই স্টেশনে

কুয়েত স্টেশনের অনিয়ম খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সেই তদন্তের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ, ঢাকায় বসে কুয়েতের ঘটনা পুরোপুরি তদন্ত করা সম্ভব নয়—এমন যুক্তিতে তদন্তের পরিধি সীমিত রাখার চেষ্টা হয়েছে।

তাদের মতে, ঝটিকা তল্লাশিতে ১৪ জনের মধ্যে ১২ জনের অতিরিক্ত ব্যাগেজ পাওয়ার মতো তথ্য সামনে আসার পরও যদি মাঠপর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না হয়, তাহলে অনিয়মের মূল হোতাদের শনাক্ত করা কঠিন।

পুরোনো প্রভাবের অভিযোগ, নতুন করে প্রশ্ন

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিগত আওয়ামী সরকারের সময়ে সর্বোচ্চ সুবিধাভোগীদের অনেকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বিমানের ভেতরে প্রভাবশালী অসাধু চক্রের মাধ্যমে বহাল রয়েছেন। কুয়েত স্টেশন ম্যানেজারের ক্ষেত্রে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ঘটনা সেই অভিযোগকে নতুন করে সামনে এনেছে বলে তাদের দাবি।

তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং এর সঙ্গে কথিত ‘ক্ষমতার প্রভাবের’ সম্পর্ক স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শাহজাহানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা ও দায় নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।