জন্মনিবন্ধনের বড় ধরনের ঘাটতির কারণে দেশের শিশুস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, টিকাদান কর্মসূচি ও জনসংখ্যা পরিকল্পনায় দেখা দিয়েছে উদ্বেগজনক অসামঞ্জস্য। নির্ভুল জন্মতথ্যের অভাবে লাখো শিশু প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার বাইরে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে দীর্ঘদিন পর দেশে আবারও বাড়তে শুরু করেছে মোট প্রজনন হার (টিএফআর), যা জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনায় নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে।
আজ বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য—তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রত্যয়ে সুন্দর আগামী গড়ি।
একই বয়সী শিশু, দুই কর্মসূচিতে ২৮ লাখের বেশি পার্থক্য
ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য পরিচালিত সাম্প্রতিক হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১ কোটি ৯৯ লাখ শিশু। অথচ একই বয়সী শিশুদের জন্য পরিচালিত ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ২ কোটি ২৬ লাখ ৬১ হাজার। অর্থাৎ একই বয়সসীমার শিশুদের দুই কর্মসূচির মধ্যে প্রায় ২৮ লাখ শিশুর পার্থক্য দেখা যায়।
জনসংখ্যাবিদদের মতে, এই বিশাল ব্যবধানের অন্যতম কারণ নির্ভুল জন্মনিবন্ধনের অভাব। ফলে প্রকৃত শিশুসংখ্যা নির্ধারণে বিভিন্ন সংস্থাকে ভিন্ন ভিন্ন তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
৩ কোটির বেশি মানুষের জন্মনিবন্ধন নেই
সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে আনুমানিক ৩ কোটি ১ লাখ ১৮ হাজার মানুষের জন্মনিবন্ধন হয়নি। ফলে প্রকৃত জন্মসংখ্যা ও বয়সভিত্তিক জনসংখ্যার নির্ভুল পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে না।
স্বাস্থ্য খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, বয়সভিত্তিক নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি, পুষ্টি কার্যক্রম, রোগ প্রতিরোধ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবার পরিকল্পনায় নানা উৎসের তথ্য ব্যবহার করতে হয়। এতে একই বয়সী শিশুদের জন্য নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচিতেও বড় ধরনের লক্ষ্যমাত্রাগত অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে।
জনসংখ্যা পরিকল্পনার ভিত্তিই জন্মনিবন্ধন
জনসংখ্যাবিদদের মতে, জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫৭ লাখে পৌঁছেছে। তবে বয়সভিত্তিক বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় না; এমন তথ্য জানতে প্রায় এক দশক অপেক্ষা করতে হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জন্মনিবন্ধন শুধু একটি নাগরিক সনদ নয়; এটি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অন্যতম ভিত্তি। জন্মের তথ্য নির্ভুল না হলে কত টিকা, কত ওষুধ, কত স্বাস্থ্যকর্মী কিংবা কত বাজেট প্রয়োজন—তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
হাসপাতাল থেকেই জন্মনিবন্ধনের ওপর জোর
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ৬৭ শতাংশ শিশুর জন্ম হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে হয়। তাই জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতাল থেকেই জন্মনিবন্ধনের ব্যবস্থা চালু করা গেলে নিবন্ধনের হার দ্রুত বাড়বে এবং জাতীয় তথ্যভান্ডার আরও নির্ভুল হবে।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে জন্ম, মৃত্যু ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার শতভাগ নিবন্ধন নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্যে প্রথম ডোজ টিকা গ্রহণের সময় জন্মনিবন্ধন সনদ প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা টাস্কফোর্সের তদারকি এবং গ্রাম পুলিশের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।
যে সমস্যাগুলো বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে
ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম বলেন, জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই নিবন্ধন নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জন্মনিবন্ধনের কার্যকর সমন্বয় করা গেলে শিশুস্বাস্থ্য পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী হবে। এজন্য হাসপাতাল থেকেই নিবন্ধনের ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
তিনি জানান, জনসচেতনতার অভাব, নিবন্ধন কর্মকর্তাদের সীমিত সক্ষমতা, জনবল ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের ঘাটতি, প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবার সীমিত প্রাপ্যতা এবং স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে দুর্বল সমন্বয় পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। অনেক সময় সার্ভার সমস্যার কারণেও সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছেন।
এ সমস্যা সমাধানে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলায় একটি পাইলট প্রকল্প চালু করা হয়েছে। সেখানে স্বাস্থ্যকর্মী, গ্রাম পুলিশ ও ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করে গ্রামীণ পর্যায়ে নিবন্ধনসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেশে আবার বাড়ছে প্রজনন হার
ইউএনএফপিএর ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মোট প্রজনন হার (টিএফআর) ২.১ উল্লেখ করা হলেও, একই বছরে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) অনুযায়ী এই হার বর্তমানে ২.৪।
একসময় দীর্ঘ প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ প্রজনন হার ২.১৭-এ নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তা আবার বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দেড় থেকে দুই বছর ধরে চাহিদার তুলনায় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ কম থাকায় এর প্রভাব পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন আরও যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। হাসপাতালকে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের দায়িত্ব দেওয়া হলে নিবন্ধনের হার দ্রুত বাড়বে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানা বলেন, নতুন কর্মসূচির আওতায় ক্রয়প্রক্রিয়া শুরু হতে সময় লাগায় কিছুদিন মাঠপর্যায়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকট তৈরি হয়েছিল। তবে বর্তমানে টেন্ডার মূল্যায়নের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ১৫ মাসের জন্য প্রয়োজনীয় পিল, কনডম, ইনজেকটেবলসহ সব ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সংগ্রহ করা হচ্ছে। সরবরাহ শুরু হলে সারা দেশে আর কোনো ঘাটতি থাকবে না।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতাল থেকেই জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা গেলে শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আশ্বাস
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, শিশুদের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার স্বাস্থ্য খাতে বড় বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে। জন্মনিবন্ধনের জটিলতায় যাতে কোনো শিশু সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য জন্মের এক সপ্তাহের মধ্যে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট ইতোমধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নতুন চালান মাঠপর্যায়ে পৌঁছালে বর্তমান ঘাটতি দ্রুত দূর হবে বলে সরকার আশাবাদী।
