সোমবার, ১৩ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৯শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ভোলায় সমাজসেবার প্রশিক্ষণে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ

আশিকুর রহমান শান্ত
জুলাই ১২, ২০২৬ ২:৫৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

১৫ দিনের প্রশিক্ষণে ৫৭,৫০০ টাকা ভাতা, উপকারভোগীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগে তোলপাড়। ফাইল ছবি : সমতল মাতৃভূমি

ভোলা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অধীনে ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি’ বাস্তবায়নে পরিচালিত দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণকে ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নীতিমালা অনুযায়ী বিভিন্ন বাস্তবমুখী ট্রেডে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকলেও রহস্যজনকভাবে মাত্র ১৫ দিনের ‘বেসিক কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন’ কোর্সে নামমাত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীকে ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা সরকারি ভাতা প্রদান করা হয়েছে। আর এই অর্থকে কেন্দ্র করেই একটি প্রভাবশালী দালাল চক্র উপকারভোগীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে আদায় করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ভোলা জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৫ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। এতে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে বেসিক কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন, ড্রেস মেকিং ও টেইলারিং, বিউটিফিকেশন, ইলেকট্রিক্যাল, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হেয়ার কাটিং, হস্তশিল্প, বেসিক ডাইভিং, মোবাইল, টিভি, ফ্রিজ ও এসি সার্ভিসিং ট্রেডে মোট ১১৩ জন আবেদন করেন। এর মধ্যে ৭ জন ছিলেন মুসলিম এবং বাকিরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী।

সম্প্রতি প্রশিক্ষণের জন্য শুধুমাত্র হিন্দু সম্প্রদায়ের ২৫ জনকে নির্বাচিত করার বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে জেলাজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

গত ১১ জুন প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বেসিক কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন ট্রেডে ২৫ জনকে নির্বাচিত করা হয়। ১৬ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ চলাকালে প্রতিদিন ৫০০ টাকা ভাতা এবং প্রশিক্ষণ শেষে ৫০ হাজার টাকার চেক প্রদান করা হয়। সব মিলিয়ে প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থী ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা করে পান।

তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচিত অধিকাংশ প্রশিক্ষণার্থী ভোলা সদর উপজেলার নিতাই চন্দ্র দাস এবং লালমোহন উপজেলার তপন কুমারের আত্মীয়-স্বজন। একই পরিবারের একাধিক সদস্য, এমনকি আপন ভাই-বোনও তালিকায় স্থান পেয়েছেন।

এছাড়া সাধারণ অনগ্রসর জনগোষ্ঠী যাতে এই আকর্ষণীয় ভাতার বিষয়ে জানতে না পারে, সেজন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির প্রচার সীমিত রাখা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রজত শুভ্র সরকার বিশ্বস্ত দালালদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের আবেদন করিয়ে প্রতিযোগিতা ছাড়াই নির্বাচনের সুযোগ করে দেন। প্রশিক্ষণ শেষে পরিকল্পিতভাবে উপকারভোগীদের কাছ থেকে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা করে আদায় করেন দালাল চক্রের প্রধান নিতাই চন্দ্র দাস, তার সহযোগী তপন চন্দ্র ও ধীরেন চন্দ্র।

সচেতন মহলের প্রশ্ন, মাত্র ১৫ দিনে কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশনের মতো বিষয়ে বাস্তব দক্ষতা অর্জন কতটা সম্ভব? তাদের মতে, বিপুল সরকারি বরাদ্দ দ্রুত বিতরণের লক্ষ্যেই এই স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া একটি অডিও কথোপকথনে অভিযোগ রয়েছে, প্রশিক্ষণ শেষে উপকারভোগীদের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে কমিশন বা ঘুষ দাবি করা হয়। বরিশালে অবস্থানরত প্রশিক্ষণার্থী রত্না রানী কথোপকথনে জানান, তিনি ও তার ভাই তপন দুজনই প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা পেয়েছেন।

টাকা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে রত্নার স্বামী সজল নেপথ্য থেকে বলেন, ১০ হাজার টাকার কথা বলছে স্যার। নেতা আছে, তারা সবাই ১০ হাজার টাকা করে নিতে আছে। নিতাই বাবু একজন আছে, সবার কাছ থেকে ১০ হাজার নিয়েছে। অলক, সজীব—ওরাও ১০ হাজার করে দিয়েছে।

রত্না রানী আরও জানান, তিনি তার মামা ধীরেন চন্দ্র দাসের মাধ্যমে প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন এবং তাকেও ১০ হাজার টাকা দিতে হবে বলে জানানো হয়েছে।

দৌলতখান উপজেলার চরপাতা ইউনিয়নের লেজপাতা গ্রামের মিঠুন চন্দ্র মণ্ডল বলেন, প্রশিক্ষণ শেষে কত টাকা পেয়েছেন এবং কাকে কত টাকা দিয়েছেন? এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলতে নিষেধ করা হয়েছে। কারা নিষেধ করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সমাজসেবা অফিস ও তার এক আত্মীয় তাকে এ বিষয়ে কথা বলতে বারণ করেছেন।

লালমোহনের সীমা রানী অভিযোগ করেন, সমাজসেবা কর্মকর্তাকে দেওয়ার কথা বলে তপন চন্দ্র তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন। পরে প্রশাসনের ভয় দেখিয়ে তিনি সেই টাকা ফেরত পান। তার দাবি, আরও কয়েকজনের কাছ থেকেও একইভাবে টাকা নেওয়া হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে রবিদাশ ফোরামের সভাপতি ও অভিযুক্ত দালাল চক্রের প্রধান নিতাই চন্দ্র দাস বলেন, ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি দাবি করেন, তার সংগঠন থেকে ১৮ জন আবেদন করলেও নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র ৬ জন। প্রশিক্ষণার্থীরা তার দূর সম্পর্কের আত্মীয় হলেও তিনি কাউকে নির্বাচিত করেননি বলে দাবি করেন।

অন্যদিকে, রবিদাশ ফোরামের সাবেক সভাপতি ধীরেন চন্দ্র দাস বলেন, আবেদনপত্র জমা দেওয়ার জন্য অফিসিয়াল ফি হিসেবে ২০০ টাকা নেওয়া হয়েছিল। নির্বাচিতরা তার আত্মীয় হলেও তারা যোগ্যতার ভিত্তিতেই সুযোগ পেয়েছেন বলে দাবি করেন।

এ বিষয়ে ভোলা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রজত শুভ্র সরকার বলেন, স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই প্রশিক্ষণার্থীদের নির্বাচন করা হয়েছে। উপজেলা, শহর কার্যালয় ও ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মৌখিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই ২৫ জনকে নির্বাচন করা হয়েছে।

উপকারভোগীদের কাছ থেকে নিতাই, ধীরেন ও তপন চন্দ্রের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমার অফিসের বাইরে কেউ যদি কিছু করে, তার দায়ভার আমার নয়।

এছাড়া, ২৫ জনই হিন্দু সম্প্রদায়ের কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মুসলিম ধর্মাবলম্বী ৭ জন আবেদন করলেও তারা কেউ নির্বাচিত হননি।

এ বিষয়ে ভোলা জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান বলেন, প্রশিক্ষণ কমিটির সভাপতি হিসেবে স্বচ্ছতার বিষয়ে আমি সমাজসেবা কর্মকর্তাকে একাধিকবার জিজ্ঞাসা করেছি। তিনি সবকিছু ঠিক আছে বলে জানিয়েছেন। তবে প্রশিক্ষণ শেষে সাংবাদিকদের মাধ্যমে অনিয়মের অভিযোগ জানতে পেরেছি। অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।