মেহেরপুর সদর সরকারি খাদ্য গুদামে চলতি বোরো ধান সংগ্রহ কার্যক্রমকে ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটনির্ভর বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি) মাসুদ রানার বিরুদ্ধে অভিযোগ—তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধান ক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। রাজনৈতিক নেতাদের নাম ব্যবহার করে অনিয়মকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে প্রকৃত কৃষকরা সরকারি গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং সরকারের কৃষকবান্ধব নীতির বাস্তবায়ন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেহেরপুর সরকারি খাদ্য গুদামে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার পরিবর্তে একটি সিন্ডিকেট পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে। অভিযোগ রয়েছে, গুদাম রক্ষক মাসুদ রানা কমিশন ভাগাভাগির মাধ্যমে ওই সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিয়ে আসছেন। সরকারি নীতিমালায় ধানের আর্দ্রতা (ময়েশ্চার) সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ থাকার কথা থাকলেও, অভিযোগ অনুযায়ী ১৮ শতাংশেরও বেশি ময়েশ্চারের ধান নির্বিঘ্নে গুদামে প্রবেশ করছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বরাদ্দের খালি বস্তা আগেভাগেই সিন্ডিকেট সদস্যদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। পরে তারা খোলা বাজার থেকে ধান কিনে সেই বস্তায় ভরে সরকারি গুদামে সরবরাহ করছেন। ধানের গুণগত মান কিংবা নির্ধারিত আর্দ্রতা যাচাইয়ে কোনো কার্যকর তদারকি নেই বলে অভিযোগ।
অন্যদিকে প্রকৃত কৃষকরা ধান নিয়ে গুদামে গেলে নানা অজুহাতে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওসিএলএসডি মাসুদ রানা কৃষকদের সরাসরি সিন্ডিকেট সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। সেখানে ধান বিক্রির সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে অনৈতিক সুবিধা দাবি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ধান ক্রয়ের আর্থিক সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছেন গুদামের এএসআই আনিস এবং দারোয়ান লাভলু। তাদের মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি। দিনশেষে কত টন ধান কেনা হয়েছে তার হিসাব মিলিয়ে নির্দিষ্ট অঙ্কের কমিশন গ্রহণ করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রকৃত কৃষকরা বঞ্চিত হলেও লাভবান হচ্ছেন সিন্ডিকেট সংশ্লিষ্টরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে মেহেরপুর সদর উপজেলায় প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে ৭৩০ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ৩ মে থেকে সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হলেও শুরু থেকেই পুরো প্রক্রিয়া সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বলে অভিযোগ। কালাচাঁদপুরসহ আশপাশের এলাকার অনেক কৃষক তালিকাভুক্ত থাকা সত্ত্বেও ধান বিক্রি করতে না পেরে ফিরে গেছেন। তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক সুপারিশ ছাড়া ধান গ্রহণ করা হচ্ছে না।
শুধু চলতি মৌসুমই নয়, বিগত আমন সংগ্রহ মৌসুমেও মাসুদ রানার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, কৃষকের প্রকৃত উৎপাদনের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ধান ক্রয়ের হিসাব দেখিয়ে পাশের জেলা থেকে ধান এনে গুদাম ভর্তি করা হয়েছিল। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ক্রয় তালিকায় যেসব কৃষকের নাম রয়েছে তাদের অনেকেই বাস্তবে গুদামে ধান বিক্রি করেননি। এমনকি তালিকাভুক্ত একাধিক মোবাইল নম্বরও ভুয়া বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, মাসুদ রানা যেখানেই দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেই অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। হাটগোপালপুরে কর্মরত থাকাকালে নিম্নমানের লালচে চাল সংগ্রহের অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল। পরে চাল পরিবর্তন করে তিনি সেই অভিযোগ থেকে রক্ষা পান বলে অভিযোগ রয়েছে।
একইভাবে যশোরের কেশবপুর এলএসডিতে দায়িত্ব পালনকালেও নিম্নমানের ধান ও চাল সংগ্রহ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। সেখানেও তদন্ত হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কেশবপুরে দুই বছর দায়িত্ব পালনের পর তিনি সাবেক আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনুর রশিদের মাধ্যমে প্রভাব খাটিয়ে চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে বদলির আদেশ পেলেও সেখানে যোগদান করেননি। পরবর্তীতে সরকারি বিধি উপেক্ষা করে মেহেরপুর সদর খাদ্য গুদামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং নেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে সরকারি গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। তারা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে ওসিএলএসডি মাসুদ রানার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মেহেরপুর জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ওসিএলএসডি মাসুদ রানার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো কল রিসিভ করেননি।
