বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেকর্ড ভবন নির্মাণ প্রকল্পে কাজ না করেই সরকারি অর্থ উত্তোলন, অনুমোদন ছাড়া একটি কাজকে আটটি প্যাকেজে ভাগ করা, টেন্ডার কারসাজি এবং কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আবারও আলোচনায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মো. সাইফুজ্জামান চুন্নু। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট আটটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দুই বছরের জন্য কালোতালিকাভুক্ত (ব্ল্যাকলিস্ট) করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। একই ঘটনায় প্রায় ৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে ১২ জুলাই জারি করা অফিস আদেশে বলা হয়েছে, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) ২০০৮-এর বিধি ১২৭ অনুযায়ী আটটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে আগামী দুই বছরের জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরের সব ধরনের ক্রয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
যেসব প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকলিস্ট হলো
কালোতালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— মেসার্স কামরুল এন্টারপ্রাইজ (মালিক: আব্দুল জলিল), মিম্পা এন্টারপ্রাইজ (মালিক: মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম), মেসার্স আর এস এন্টারপ্রাইজ (মালিক: মো. দেলোয়ার হোসেন), মেসার্স গোমতী এন্টারপ্রাইজ (মালিক: খোকন), রাশা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল (মালিক: রাহাত আব্দুল্লাহ), মেসার্স স্বদেশ ডেভেলপমেন্ট (মালিক: আব্দুল জলিল), গ্রাম বাংলা এবং কর্ণফুলী কনস্ট্রাকশন।
অনুমোদন ছাড়াই আট প্যাকেজ, তারপর কোটি টাকার বিল
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেকর্ড ভবন নির্মাণ প্রকল্পের মূলধন অংশের ডব্লিউ-১ (সংশ্লিষ্ট সিভিল ওয়ার্কস) প্যাকেজটি ডিপিপি, আরডিপিপি কিংবা প্রকল্প পরিচালকের অনুমোদন ছাড়াই বিধিবহির্ভূতভাবে আটটি পৃথক প্যাকেজে বিভক্ত করা হয়। পরে ই-জিপির মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করে সেই প্যাকেজগুলোর বিপরীতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের কাগজপত্র তৈরি করা হয়।
তদন্ত কমিটি আরও দেখতে পায়, বিভাজিত আটটি প্যাকেজের নামে বিল পরিশোধ করা হলেও বাস্তবে কাজের কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। অথচ ২০২৩–২৪ অর্থবছরে মোট ৬ কোটি ৩১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা সরকারি অর্থ ব্যয় দেখিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটির মূল কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড। কিন্তু তাদের বাইরে আরও আটটি প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া বিল পরিশোধের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে।
কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী আট প্রতিষ্ঠানকে ব্ল্যাকলিস্ট করার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।
ফরিদপুরেও একই অভিযোগ, পরে বদলি
অভিযোগ রয়েছে, ফরিদপুরে কর্মরত থাকাকালে মডেল মসজিদ মেরামত ও সংস্কারের আড়ালে টেন্ডার বাণিজ্য, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠার পর তড়িঘড়ি করে তাকে মেহেরপুরে বদলি করা হয়। পরবর্তীতে মেহেরপুরেও বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এলে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বদলি হলেও তার পুরোনো সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয় রয়েছে।
টেন্ডার কারসাজির অভিযোগও রয়েছে
অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি ক্রয় বিধিমালা ও প্রধান প্রকৌশলীর নির্দেশনা উপেক্ষা করে পছন্দের ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে ছোট ও মেরামত কাজেও এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
সম্প্রতি ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সালথা উপজেলা মডেল মসজিদের জানালা, সিভিল, স্যানিটারি ও ইলেকট্রিক মেরামতের জন্য টেন্ডার আইডি ১০৬২১৬০-এ দরপত্র আহ্বান করা হয়। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে টেন্ডার আইডি ১০৫৩৮১২ এবং ১০৫৫৪৩৫ নিয়েও। অভিযোগকারীদের দাবি, ১৩ জানুয়ারি ২০২৫ একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদিত হলেও বিল পরিশোধের বিষয়টি স্পষ্ট নয়।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, প্রকৌশলী সাইফুজ্জামান চুন্নু বিগত সরকারের সময় প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফ আহমেদের আশীর্বাদপুষ্ট কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ও বিভিন্ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড়?
অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে তিনি ঢাকা, পটুয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগে উল্লেখিত সম্পদের মধ্যে রয়েছে—
. মোহাম্মদপুরে একটি বাড়ি।
. বারিধারায় একটি ফ্ল্যাট।
. ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোডে একটি ফ্ল্যাট।
. বেইলি রোডে একটি ফ্ল্যাট।
. গুলশান নিকেতনে একটি ফ্ল্যাট।
. সাভারে ১০ কাঠার একটি প্লট।
. পটুয়াখালীতে ‘নাহিয়ান ব্রিকস ফিল্ড’।
. কলেজ রোডে দোতলা বাড়ি।
. সদর উপজেলার কমলাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ধারান্দি গ্রামে প্রায় ৫ একর জমি।
. ‘নেক্সাস’ নামে একটি গার্মেন্টস শোরুম।
এছাড়া, সংশ্লিষ্টদের দাবি অনুযায়ী, দুবাইয়েও তার একটি বাড়ি রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযুক্তের বক্তব্য
এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুজ্জামান চুন্নুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার ভাষ্য, গত ৫ আগস্ট সালথা উপজেলা মডেল মসজিদ ভাঙচুর হওয়ায় তা মেরামতের প্রয়োজন হয়েছে, তাই টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে।
অবৈধ সম্পদের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমার সকল সম্পদের হিসাব বিবরণী আয়কর ফাইলে দেওয়া আছে।
সচেতন মহলের দাবি
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, টেন্ডার কারসাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগে উল্লিখিত সম্পদের প্রকৃত উৎস অনুসন্ধান করে রাষ্ট্রের ক্ষতি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। অভিযোগ সংশ্লিষ্ট আরও তথ্য, নথি ও নতুন তথ্য-উপাত্ত নিয়ে প্রকাশিত হবে পরবর্তী প্রতিবেদনে।
