সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে টেন্ডার জালিয়াতি, কমিশন বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন অভিযোগপত্র, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে তিনি সওজের প্রশাসনিক ও প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যবস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার করে একটি শক্তিশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেট পরিচালনা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মনিরুজ্জামান কক্সবাজার, মুন্সিগঞ্জ, রংপুর ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকালে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও নতুন পরিচয়ে প্রশাসনিক প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সওজের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, জনবল নিয়ন্ত্রণ ও বদলি-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখায় তাঁর অদৃশ্য প্রভাব এখনও বহাল রয়েছে। সুবিধাজনক পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, কক্সবাজার সড়ক বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অতিরিক্ত প্রাক্কলন, অসমাপ্ত কাজের বিপরীতে বিল উত্তোলন এবং প্রায় ১৫০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। পরে রাজশাহী জোনে দায়িত্ব পালনকালে কয়েকজন প্রভাবশালী ঠিকাদারকে নিয়ে একটি ‘কোর সিন্ডিকেট’ গড়ে তুলে কমিশন ছাড়া টেন্ডার পাওয়া কার্যত অসম্ভব করে তোলার অভিযোগও উঠে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) লঙ্ঘন করে দরপত্রের শর্ত এমনভাবে তৈরি করা হতো, যাতে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট ছাড়া অন্য কোনো ঠিকাদার প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারে। পরিকল্পনা ও উন্নয়ন উইংয়ের একাধিক সূত্রের দাবি, প্রকল্প অনুমোদনে ৫ থেকে ৮ শতাংশ কমিশন ছাড়া কোনো ফাইল এগোত না।
মুন্সিগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে নিম্নমানের সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়ক বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ত।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গত এক দশকে ঢাকা, ফরিদপুর ও রাজশাহীতে নিজের ও আত্মীয়-স্বজনদের নামে বিপুল পরিমাণ জমি, বাণিজ্যিক প্লট, ফ্ল্যাট, এফডিআর ও সঞ্চয়পত্র গড়ে তুলেছেন তিনি। রাজধানীর বনানী, গুলশান, বসুন্ধরা ও নিকেতন এলাকায় মূল্যবান সম্পদের তথ্যও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি হুন্ডির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও দুবাইয়ে অর্থ পাচারের অভিযোগও উঠেছে।
দুদকের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, মনিরুজ্জামানের ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তির দলিল এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই চলছে। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সড়ক খাতে ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরে বলেছে, প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক-প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া দীর্ঘদিন টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. মনিরুজ্জামানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগে সরকার শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণ করবে এবং তদন্ত সংস্থাকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি। অভিযোগগুলো তদন্তাধীন এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আদালতে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়নি।
সাম্প্রতিক মনিরুজ্জামান ৫০ কোটি টাকা নিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর পদ বাগাতে মাঠে নেমেছে।এ নিয়ে বাড়ির হোল্ডিং নম্বরসহ বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে……….
