২২ বছর গৃহকর্মী হিসেবে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন, শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার এবং পরবর্তীতে ধর্ষণের অভিযোগ তুলে প্রশাসনের কাছে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন কুমু বেগম (২৭) নামে এক নারী। একই সঙ্গে অভিযুক্ত মো. জাহাঙ্গীর লতিফের বিরুদ্ধে গত বছরের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। ঢাকার মিরপুর-১০ নম্বর সেনপাড়া পর্বতার ৬ নম্বর রোডের ১৫ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত মিরপুর প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন ভুক্তভোগী।
সংবাদ সম্মেলনে কুমু বেগম বলেন, পরিবারহীন হয়ে পড়ার পর ২০০৫ সালের দিকে মাত্র সাত বছর বয়সে তাকে কাফরুল থানার উত্তর ইব্রাহিমপুর এলাকার মুন্সি বাড়ির বাসিন্দা মো. জাহাঙ্গীর লতিফের বাসায় গৃহপরিচারিকা হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথমদিকে স্বাভাবিকভাবে কাজ করানো হলেও পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করানো হয় এবং নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার দাবি, একপর্যায়ে গৃহকর্তা তার ওপর যৌন নির্যাতন চালান। ভয় ও অসহায়ত্বের কারণে দীর্ঘদিন তিনি বিষয়টি প্রকাশ করতে পারেননি।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, তাকে একাধিকবার বাসার ভেতরে আটকে রাখা হয়। এমনকি এক পর্যায়ে টানা তিন দিন তালাবদ্ধ অবস্থায় রাখা হয়েছিল। বিয়ের বয়স হলে বিয়ের খরচ বহনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও পরে তা রক্ষা না করে তাকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই কোনো অর্থ বা নিরাপত্তা ছাড়াই তাকে চট্টগ্রামগামী একটি বাসে তুলে দেওয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, জাহাঙ্গীর লতিফের স্ত্রী এবং দুই কন্যা—জেবা রাইসা ও দিয়া রাইসাও বিভিন্ন সময়ে তার ওপর মানসিক চাপ ও নির্যাতন চালাতেন।
ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে পাঠানো আইনি নোটিশে শ্রম আইনের আওতায় ১৯ বছরের বকেয়া মজুরি (মাসিক ৩ হাজার টাকা হিসেবে) ৬ লাখ ৮৪ হাজার টাকা এবং বিয়ের খরচ বাবদ প্রতিশ্রুত ২ লাখ টাকাসহ মোট ৮ লাখ ৮৪ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে।
এ ঘটনায় কুমু বেগম বাদী হয়ে কাফরুল থানায় মো. জাহাঙ্গীর লতিফের বিরুদ্ধে প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ, আঘাত, ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ প্রযোজ্য আইনি ধারায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলা নম্বর: ১০৬/২০২৬।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, জাহাঙ্গীর লতিফের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে মিলন নামে একজন তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সহায়তা করতেন। এছাড়া অভিযোগকারীরা দাবি করেন, জাহাঙ্গীর লতিফ রাজনৈতিকভাবে গাজী মেজবাউর হক সাচ্চুর ঘনিষ্ঠ এবং তার আর্থিক দেখভালের দায়িত্ব পালন করতেন।
একই সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় মিরপুর-১০ এলাকায় সংঘটিত হামলা ও সহিংসতার ঘটনায় জাহাঙ্গীর লতিফ গাজী মেজবাউর হক সাচ্চুর সহযোগী হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর লতিফ বর্তমানে উত্তর ইব্রাহিমপুর এলাকায় ৪০৫ নম্বর বাড়িতে বসবাস করেন এবং তার মালিকানায় আরও একটি ছয়তলা ভবনসহ একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে মো. জাহাঙ্গীর লতিফ, মিলন এবং গাজী মেজবাউর হক সাচ্চুর বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মামলার তদন্ত এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই শেষে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন।
