চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি, পানিবন্দী ২ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি পরিবার, আশ্রয়কেন্দ্রে হাজারো দুর্গত। শনিবার চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে ছবিটি তোলা হয়েছে
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের কারণে সৃষ্ট বন্যায় ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৩৯ জন আহত হয়েছেন।
রোববার (১২ জুলাই) দুপুরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত হালনাগাদ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ, এই সাত জেলায় বন্যার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। এসব জেলার ৫৮টি উপজেলা, ৩৮৬টি ইউনিয়ন এবং ১১টি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে। দুর্গত মানুষের জন্য ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে বর্তমানে ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
চট্টগ্রামে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। জেলার ১৬টি উপজেলার ১৫২টি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় বন্যার প্রভাব পড়েছে। পানিবন্দী হয়েছেন ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৫ লাখ ৯৫ হাজার। জেলায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১২ জন আহত হয়েছেন। বর্তমানে ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২১ হাজার ৯০০ মানুষ অবস্থান করছেন। দুর্গতদের মধ্যে চাল, নগদ অর্থ, শুকনো খাবার ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।
কক্সবাজারে প্রাণহানি সবচেয়ে বেশি
কক্সবাজারে বন্যায় ১০টি উপজেলার ৭০টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দী হয়েছেন ৩৯ হাজার ৫০৬ পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৭। জেলায় স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গাসহ মোট ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা। আহত হয়েছেন ২৪ জন, তাঁদের মধ্যে পাঁচজন রোহিঙ্গা। এছাড়া একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। জেলার ২৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ৫৮০ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
অন্যান্য জেলার পরিস্থিতি
বান্দরবানে সাতটি উপজেলার ৩৪টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দী হয়েছেন ১২ হাজার ৫০০ পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৮৩ হাজার ৫০০। সেখানে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে এবং দুজন আহত হয়েছেন। ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৬ হাজার ২৫০ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
রাঙামাটিতে নয়টি উপজেলার ৪৩টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। পানিবন্দী ১ হাজার ৪৪টি পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৩ হাজার ৫২৪। সেখানে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ৫০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ হাজার ৬৩৭ জন অবস্থান করছেন।
খাগড়াছড়িতে নয়টি উপজেলার ৩৩টি ইউনিয়ন ও তিনটি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দী ১ হাজার ৭৩টি পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৩৪ হাজার ৪১৭। সেখানে একজন আহত হয়েছেন। ১৫০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২ হাজার ৮৮৩ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
মৌলভীবাজারে পাঁচটি উপজেলার ৩১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী ৭ হাজার ৩০৮ পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ২৬ হাজার ৫৪৪। সেখানে একজনের মৃত্যু হয়েছে। ২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২ হাজার ১৭২ জন অবস্থান করছেন।
হবিগঞ্জে তিনটি উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়েছেন ৬ হাজার ৪৪৪ পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ২৮ হাজার ১৪০। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, দুটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও এখনো সেখানে কেউ আশ্রয় নেননি।
ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ৭ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত সাত জেলার জন্য ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা নগদ এবং ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দেশের ৬৪ জেলার জন্য মানবিক সহায়তা হিসেবে ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ৮ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয় আরও জানায়, স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে উদ্ধার, আশ্রয় ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতির প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হবে।
