শনিবার, ৩১শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সাবেক ডিবিপ্রধান হারুনের সম্পদের ‘রক্ষক’ ছোট ভাই শাহরিয়ার! শ্রীমঙ্গলের প্যারাগন রিসোর্টের মূল্য দেখানো ১১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, স্থপতিদের হিসাবে নির্মাণ ব্যয় অন্তত ২০০ কোটি

নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর ৩১, ২০২৬ ১:২৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মালিকানায় শাহরিয়ার, রাকিব ও রোকন; অডিটে শেয়ারের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন, অর্থের উৎস অনুসন্ধানে আয়কর গোয়েন্দারা। ফাইল ছবি

গুম-খুন ও অপহরণের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ উপার্জনের অভিযোগে আলোচিত-সমালোচিত সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে এবার সামনে এসেছে সম্পদ গোপন ও মালিকানা পরিবর্তনের নতুন তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, নামে-বেনামে গড়ে তোলা সম্পদের রক্ষক হিসেবে নিজের ছোট ভাইকে ব্যবহার করেছেন তিনি। কর ফাঁকি দিতে চিকিৎসক ভাইকে কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে ‘প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট’ ও শ্রীমঙ্গলের রাধানগরে ‘প্যারাগন রিসোর্ট’-এর মালিকানায় যুক্ত করা হয়। এসব সম্পদের অর্থের উৎস নিয়ে তদন্ত করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট।

সম্প্রতি প্যারাগন রিসোর্টের একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদন (অডিট রিপোর্ট) এসেছে যুগান্তরের হাতে। প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের রাধানগরে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন তিন তারকা মানের রিসোর্টটির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতে মোট সম্পদের মূল্য দেখানো হয়েছে ১১ কোটি ৫৭ লাখ আট হাজার টাকা। অথচ দেশের শীর্ষস্থানীয় স্থপতিদের ধারণা, এই স্থাপনা নির্মাণে ব্যয় হয়েছে অন্তত ২০০ কোটি টাকা।

সুইমিং পুল, জিম, স্পা, হট টাব, প্লে জোন, ইনডোর গেমস ও কনফারেন্স রুমসহ নানা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে রিসোর্টটিতে। এর ৩৫০ স্কয়ার ফিটের একটি কক্ষের ভাড়া ১৬ থেকে ২০ হাজার টাকা। এমন বিলাসবহুল স্থাপনার সম্পদের মূল্য নিরীক্ষিত হিসাবে এত কম দেখানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২০০ কোটি টাকার স্থাপনা, হিসাব মাত্র ১১ কোটি ৫৭ লাখ

প্যারাগন রিসোর্টের আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদের ছোট ভাই চিকিৎসক ডা. এবিএম শাহরিয়ারও রয়েছেন এর মালিকানায়। তবে আগের অর্থবছরে তার নামে থাকা এক কোটি পাঁচ লাখ টাকার শেয়ার পরের বছরের হিসাব থেকে বাদ পড়েছে।

অন্যদিকে কোম্পানির দুই শেয়ারহোল্ডারের শেয়ার বেড়েছে। পাশাপাশি নতুন করে দুই কোটি টাকা শেয়ার মানি ডিপোজিট দেখানো হয়েছে। এসব অর্থের উৎস, শেয়ার মালিকানা পরিবর্তন এবং অবকাঠামো নির্মাণে অর্থায়নের বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন আয়কর কর্মকর্তারা।

প্যারাগন রিসোর্টের মালিকানায় রয়েছেন রাকিব উদ্দিন দেওয়ান (রতন) ও রোকন উদ্দিন দেওয়ান (স্বপন)। তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, এই দুই ভাই ডিবি হারুনের অপকর্মের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ক্যাশিয়ার ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। হারুন গাজীপুরে পুলিশ সুপার পদে থাকাকালে তাদের বিরুদ্ধে নানা অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে।

একসময় সাধারণ ব্যবসা করা রতন ও স্বপন ডিবি হারুনের স্ত্রী শিরীন আক্তারকে ধর্মের বোন বানান। এরপরই তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। ডিবি হারুনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে বিভিন্ন ব্যবসা, সম্পত্তি ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে রতন ও স্বপন প্রায় হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, গুম-খুন ও অপহরণের মাধ্যমে হারুনের উপার্জিত অবৈধ অর্থ তারা বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। পরে সেই ব্যবসার অংশীদার করা হয় হারুনের ছোট ভাই শাহরিয়ারকে।

এক বছরে সম্পদ বেড়েছে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা

প্যারাগন রিসোর্টের ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, কোম্পানির মোট সম্পদ ১১ কোটি ৫৭ লাখ আট হাজার টাকা। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল আট কোটি ১৭ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে সম্পদ বেড়েছে প্রায় তিন কোটি ৪০ লাখ টাকা।

স্থায়ী সম্পদ খাতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেখানো হয়েছিল সাত কোটি ২৫ লাখ ৪২ হাজার টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ১৭ লাখ ৯৮ হাজার টাকা।

অথচ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর গোয়েন্দা ইউনিট দেশের কয়েকজন শীর্ষ স্থপতির সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছে, এই স্থাপনা নির্মাণে ব্যয় হয়েছে অন্তত ২০০ কোটি টাকা। ফলে নির্মাণব্যয় ও নিরীক্ষিত হিসাবে দেখানো সম্পদের মূল্যের মধ্যে বিশাল ব্যবধানের বিষয়টি সামনে এসেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আয়কর গোয়েন্দা ইউনিটের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, নির্মাণব্যয়ের সঙ্গে নিরীক্ষিত হিসাবে দেখানো সম্পদের মূল্যের বড় ব্যবধান রয়েছে। নির্মাণ ব্যয়, জমির মূল্য, অবচয় ও সম্পদের হিসাব কোন ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে—এসব বিষয়ে অনেকটাই নিশ্চিত হওয়া গেছে।

তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে কোম্পানির জমি ও ভবন কেনার দলিল, নির্মাণকাজের চুক্তি, ঠিকাদারদের বিল, ব্যাংক লেনদেন, ঋণের তথ্য ও সম্পদ মূল্যায়নের প্রতিবেদন পরীক্ষার কাজ শুরু হয়েছে। নির্মাণব্যয়ের কোনো অংশ অন্য প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির হিসাবে দেখানো হয়েছে কি না, তাও যাচাই করা হবে।

এক কোটি পাঁচ লাখ টাকার শেয়ার উধাও!

অডিট রিপোর্টের শেয়ারহোল্ডিং বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এবিএম শাহরিয়ারের নামে ছিল এক লাখ পাঁচ হাজার শেয়ার। প্রতিটি শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০০ টাকা হিসাবে এর মোট মূল্য এক কোটি পাঁচ লাখ টাকা।

কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেয়ারহোল্ডিং তালিকায় তার নাম নেই। একই সময়ে মোহাম্মদ রাকিব উদ্দিন দেওয়ান ও মোহাম্মদ রোকন উদ্দিন দেওয়ানের প্রত্যেকের শেয়ারসংখ্যা দুই লাখ ৪৫ হাজার থেকে বেড়ে দুই লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ হয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যেকের শেয়ার বেড়েছে ৫২ হাজার ৫০০টি করে।

অন্যদিকে কোম্পানিতে নতুন করে দুই কোটি টাকা শেয়ার মানি ডিপোজিট দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে মোহাম্মদ হোসাইন খানের ৩০ লাখ টাকা এবং রাকিব উদ্দিন দেওয়ান ও রোকন উদ্দিন দেওয়ানের প্রত্যেকের ৮৫ লাখ টাকা রয়েছে।

আয়কর গোয়েন্দাদের ধারণা, শাহরিয়ারের শেয়ার হস্তান্তরের দলিল, শেয়ার বিক্রির মূল্য ও নতুন বিনিয়োগের অর্থের উৎস যাচাই করলে মালিকানা পরিবর্তনের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যেতে পারে।

অডিট রিপোর্টে অবশ্য শেয়ারগুলো কার কাছে এবং কী মূল্যে হস্তান্তর করা হয়েছে, তার বিস্তারিত উল্লেখ নেই। এ কারণে শেয়ার হস্তান্তরের প্রক্রিয়া ও অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ডিবি হারুন প্রভাব খাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা নিজের ভাইয়ের নামে করিয়েছিলেন। পরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মালিকানাতেও পরিবর্তন এসেছে।

হারুন ও শাহরিয়ারের বিরুদ্ধে দুদকের মামলাও

সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ ও তার ছোট ভাই এবিএম শাহরিয়ারের সম্পদের উৎস নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।

দুদক হারুন ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে পৃথক মামলায় অভিযোগপত্র অনুমোদন করেছে। সংস্থাটির অনুসন্ধানে হারুনের বিরুদ্ধে প্রায় ২০ কোটি টাকা এবং তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে প্রায় ১৮ কোটি ২৮ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে।

প্যারাগন রিসোর্টের নির্মাণব্যয়, সম্পদের মূল্য, শেয়ার মালিকানা পরিবর্তন ও বিনিয়োগের অর্থের উৎস নিয়ে আয়কর গোয়েন্দা ইউনিটের অনুসন্ধান শেষ হলে এসব অভিযোগের বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য সামনে আসতে পারে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ