দুবাইয়ে তিন ভাইয়ের সঙ্গে স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের যোগাযোগের দাবি, আত্মীয়স্বজনের হিসাবেও শতকোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ। সীমান্তের চার উপজেলা ঘিরে মাদক, স্বর্ণ ও ভারতীয় পণ্যের অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগ; তিন থানার ওসিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়েও প্রশ্ন। ফাইল ছবি
সিলেটের গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাচালানের বিশাল নেটওয়ার্ক নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে গোয়েন্দা পুলিশের নায়েক মো. সিদ্দিকুর রহমানের সম্পৃক্ততার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও একপর্যায়ে নিজেই সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধজগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। স্থানীয়ভাবে তাঁকে সীমান্তের চোরাচালান চক্রের প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবেও দাবি করা হচ্ছে।
পুলিশের নায়েক সিদ্দিকুর রহমানের বাড়ি সিলেটের গোয়াইনঘাট এলাকায়। চাকরির সুবাদে তিনি পার্শ্ববর্তী সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলায় দায়িত্ব পালন করেছেন। গত পাঁচ বছর এসব এলাকায় কর্মরত থাকার সময় সিলেট অঞ্চলের সীমান্তকেন্দ্রিক বিভিন্ন অবৈধ বাণিজ্যে তাঁর সম্পৃক্ততা নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে।
চার সীমান্ত উপজেলা ঘিরে চোরাচালানের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক
অনুসন্ধানে পাওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, গোয়াইনঘাট, জকিগঞ্জ, কানাইঘাট ও জৈন্তাপুর সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে মাদক, জিরা, প্রসাধনসামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য বালুবাহী ট্রাকে করে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করানো হয়। পরে এসব পণ্য হবিগঞ্জ ও ভৈরব হয়ে রাজধানীর চকবাজারসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে পৌঁছে দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এই অবৈধ পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্য ঘিরে প্রতি মাসে প্রায় ১০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট ব্যবহার করে পণ্য প্রবেশ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের পুরো প্রক্রিয়ায় একাধিক ব্যক্তির সমন্বয়ে একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
২৫ কোটি টাকার স্বর্ণের চালান ঘিরে রহস্য
পুলিশের নায়েক সিদ্দিকুর রহমানকে ঘিরে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে স্বর্ণ চোরাচালান নিয়ে। একটি গোপন সূত্রের দাবি, প্রায় এক মাস আগে দুবাই থেকে আনুমানিক ২৫ কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণের একটি চালান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসে। অভিযোগ রয়েছে, দুবাইয়ে অবস্থানরত সিদ্দিকুর রহমানের তিন ভাইয়ের সঙ্গে স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের যোগাযোগ রয়েছে। তাঁদের মাধ্যমেই ওই চালান বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল বলে সূত্রটি দাবি করেছে।
সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে স্বর্ণের চালানটি সিলেটের এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পুলিশের নায়েক সিদ্দিকুর রহমানসহ তাঁর সহযোগী হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের চালানটি গ্রহণ করার কথা ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে গোয়েন্দা সংস্থার অভিযানের খবর পেয়ে সংশ্লিষ্টরা চালানটি সিদ্দিকুর রহমানের সিন্ডিকেটের এক সদস্যের কাছে রেখে সরে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে ওই সদস্য স্বর্ণের চালানটি আত্মসাৎ করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সীমান্ত এলাকার দুটি চোরাচালান সিন্ডিকেটের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে স্বর্ণের চালান, এর মালিকানা, পরিবহন ও আত্মসাতের অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তিন ব্যাংক হিসাবে দুই মাসে ৫ কোটি টাকার লেনদেন!
একজন পুলিশ নায়েকের আর্থিক লেনদেন নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগ করা হচ্ছে, গোয়েন্দা পুলিশের নায়েক সিদ্দিকুর রহমানের তিনটি ব্যাংক হিসাবে গত দুই মাসে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। শুধু তাঁর নিজের ব্যাংক হিসাবেই নয়, আত্মীয়স্বজনের ব্যাংক হিসাবেও শতকোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
একটি সূত্রের দাবি, ইউপি সদস্য মুর্তজা আলীও এই চক্রের সদস্য। তবে অভিযোগের বিষয়ে মুর্তজা মেম্বার বলেন, আমি খুব জনপ্রিয় হওয়ায় চোরাচালান চক্র আমার নাম বলে। পুলিশ সিদ্দিক খুব ভালো ছেলে। আর ব্যাংকের সব টাকা তার ভাইদের।
তাঁর এই বক্তব্যে সিদ্দিকুর রহমানের ব্যাংক হিসাবের অর্থের মালিকানা নিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একজন পুলিশ সদস্যের চাকরির আয় ও দৃশ্যমান আর্থিক সামর্থ্যের সঙ্গে এত বিপুল অঙ্কের লেনদেনের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এসব অর্থের উৎস, প্রকৃত সুবিধাভোগী এবং লেনদেনের সঙ্গে চোরাচালান চক্রের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
এ বিষয়ে পুলিশের নায়েক সিদ্দিকুর রহমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মুর্তজা আলী মেম্বার আরও দাবি করেছেন, তাঁর ভাইয়েরা দুবাইয়ে ব্যবসা করেন। টাকাপয়সার প্রকৃত মালিক মূলত তাঁর ভাইয়েরা; সিদ্দিকুর রহমানের নিজের তেমন কিছু নেই।
দুদক ও পুলিশ অধিদপ্তরে অভিযোগ
সিদ্দিকুর রহমানের নামে এবং তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের আর্থিক লেনদেন ও সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক পর্যায়েও অভিযোগ জমা পড়েছে। স্থানীয় ব্যক্তি দুলাল আহমেদ তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পুলিশ অধিদপ্তরে দুটি অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
দুলাল আহমেদের দাবি, এই চক্রের সঙ্গে মুর্তজা মেম্বারও জড়িত। তাঁর অভিযোগ, সীমান্তকেন্দ্রিক অবৈধ বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তিন থানার ওসিদের সঙ্গে সুসম্পর্কের অভিযোগ
সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাচালান কার্যক্রমে সিদ্দিকুর রহমানের সঙ্গে তিনটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সুসম্পর্ক রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এই সম্পর্কের সূত্র ধরে সীমান্ত এলাকায় অবৈধ পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যে কোনো ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং সীমান্ত এলাকায় পণ্য পরিবহনের বিষয়ে পুলিশের ভূমিকা পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
সিলেট সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাচালান, হুন্ডি ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পরপরই পুলিশের নায়েক মো. সিদ্দিকুর রহমানকে শিল্প পুলিশে বদলি করে পুলিশ অধিদপ্তর। তবে এই বদলির সঙ্গে প্রকাশিত অভিযোগের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জকিগঞ্জ-জৈন্তাপুরে দুই ওসির বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ
এদিকে সিলেট জেলার জকিগঞ্জ ও জৈন্তাপুর থানার দুই ওসির বিরুদ্ধে চোরাচালান, অবৈধ পণ্য পরিবহন এবং ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জকিগঞ্জ, জৈন্তাপুর, বারুইবাজার, সোনারহাট, সুতারকান্দি ও হরিপুর সীমান্ত এলাকা।
অভিযোগ অনুযায়ী, জকিগঞ্জ থানার ওসি আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে বারুইবাজার, সোনারহাট ও সুতারকান্দি সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় অবৈধ পণ্য পরিবহনে সহায়তার বিনিময়ে প্রতি মাসে প্রায় তিন কোটি টাকা ঘুষ বা বখরা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
সীমান্তের এসব পয়েন্ট দিয়ে কী পরিমাণ অবৈধ পণ্য প্রবেশ করছে, কারা পরিবহন ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে জড়িত এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কেউ এ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করছেন কি না, তা নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে। জৈন্তাপুর থানার ওসির বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিস্তারিত এবং সংশ্লিষ্ট বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
আর্থিক লেনদেন ও প্রশাসনিক ভূমিকা তদন্তের দাবি
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, পুলিশের নায়েক সিদ্দিকুর রহমানের তিনটি ব্যাংক হিসাব, তাঁর ভাই ও আত্মীয়স্বজনের আর্থিক লেনদেন, দুবাইয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগ এবং সীমান্তের চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা, সবকিছু সমন্বিতভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে স্বর্ণের কথিত চালান, সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় পণ্য প্রবেশ, বালুবাহী ট্রাকে পণ্য পরিবহন, হুন্ডি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের লেনদেন, অর্থের উৎস ও সুবিধাভোগী, সীমান্তের চেকপোস্ট ও পরিবহনসংক্রান্ত তথ্য এবং প্রশাসনিক নথি পরীক্ষা করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং তদন্তের ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে বিষয়টির স্বচ্ছ নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, এ প্রতিবেদনে উল্লিখিত আর্থিক লেনদেন, স্বর্ণের চালান, চোরাচালান ও ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়গুলো অভিযোগ ও সূত্রের দাবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন ও চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারিত হয়নি। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। চলবে………
