নেত্রকোনার দুর্গাপুর সীমান্তঘেঁষা এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার করে মাদক বাণিজ্য ও সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগ ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ—বিশেষ করে হোয়াটসঅ্যাপ ও ইমু—এবং সাধারণ মোবাইল ফোন কল ব্যবহার করে পরিচালিত হচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ যোগাযোগ ব্যবস্থা। অভিযোগ রয়েছে, রাতের আঁধারে এসব মাধ্যমে সংকেত বিনিময় করে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের চালান হাতবদল করা হচ্ছে এবং একই সঙ্গে অবৈধ অস্ত্রের মহড়ার মাধ্যমে এলাকায় ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে।
চাঞ্চল্যকর এসব অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম নিজ তত্ত্বাবধানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে (Close Monitoring) নিয়েছেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগে মাদক কারবারের অভিযোগ
অনুসন্ধানী তথ্যে জানা যায়, সংশ্লিষ্ট চক্রটি অত্যন্ত কৌশলে এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিজেদের যোগাযোগ গোপন রাখার চেষ্টা করছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট ও বিশ্বস্ত ক্রেতাদের সঙ্গে মাঝে মধ্যে সাধারণ মোবাইল ফোন কলের মাধ্যমেও মাদক কেনাবেচা ও আর্থিক লেনদেনের পরিকল্পনা করা হয়।
স্থানীয় একাধিক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের দাবি, গভীর রাতে কোড ভাষায় বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে চালান পৌঁছে দেওয়ার স্থান নির্ধারণ করা হয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই গোপন যোগাযোগ ব্যবস্থার আড়ালেই সীমান্ত এলাকায় ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের বড় চালান হাতবদল হচ্ছে।
অস্ত্রের মহড়া, আতঙ্কে স্থানীয়রা
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে একটি সশস্ত্র কিশোর গ্যাং ও অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে। গভীর রাতে তলোয়ার, রামদাসহ বিভিন্ন অবৈধ অস্ত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়ভীতি সৃষ্টি করা হয়।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রভাবশালী এই চক্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনেকেই সাহস পান না। ফলে এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ও নীরবতা বিরাজ করছে।
প্রমাণ সংরক্ষণে পরিচয় গোপন
তদন্তের স্বার্থে এবং অভিযুক্তরা যাতে আগাম সতর্ক হয়ে পালিয়ে যেতে না পারে কিংবা সম্ভাব্য ডিজিটাল তথ্য ও কল রেকর্ড নষ্ট করার সুযোগ না পায়, সে কারণে এই প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও নির্দিষ্ট গ্রামের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
তবে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট এনক্রিপ্টেড আইডি, ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর, সম্ভাব্য অস্ত্রের অবস্থান এবং সুনির্দিষ্ট লোকেশনসহ বিভিন্ন তথ্য জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এসপির কড়া বার্তা
এ বিষয়ে নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। প্রাপ্ত তথ্য ও নথি আমার টেবিলে আসার পর থেকেই বিষয়টি আমার সরাসরি বিশেষ মনিটরিংয়ে রয়েছে। অভিযুক্তরা যাতে পালাতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও গোপন নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তথ্য-প্রমাণ যাচাই শেষে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা এবং অস্ত্র উদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পুলিশ সুপারের সরাসরি তদারকি ও কঠোর অবস্থানের পর সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় মাদক ও অস্ত্র সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম আরও জোরদার হবে বলে স্থানীয়দের প্রত্যাশা। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সীমান্ত অঞ্চলে অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এমন আশাই করছেন সচেতন মহল।
