রবিবার, ১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৯শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

স্রোতে তলিয়ে যাচ্ছিলেন পাঁচজন, দুজনকে বাঁচিয়ে নিজেই হারিয়ে গেলেন সৌরভ

শিবপুর (নরসিংদী) প্রতিনিধি
সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬ ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

শীতলক্ষ্যার স্রোতে মৃত্যুর মিছিল, উদ্ধার করতে গিয়ে তরুণের আত্মত্যাগ।শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল করতে নামার আগে সেলফিতে নারী-শিশুসহ ছয়জন। ফাইল ফটো

নরসিংদীর শিবপুরে শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল করতে নেমে তীব্র স্রোতে তলিয়ে যাচ্ছিলেন নারী, শিশুসহ পাঁচজন। একের পর এক মানুষ যখন স্রোতের টানে ভেসে যাচ্ছিলেন, তখন জীবনের মায়া তুচ্ছ করে তাদের উদ্ধারে নদীতে ঝাঁপ দেন স্থানীয় তরুণ সৌরভ মিয়া। শিশুসহ দুজনকে উদ্ধার করে নিরাপদে পাড়ে তুলে দেওয়ার পরও থামেননি তিনি। আরেকজনকে বাঁচাতে ফের নদীতে ঝাঁপ দেন। কিন্তু এবার সেই ভয়ংকর স্রোতই কেড়ে নেয় সাহসী তরুণের প্রাণ।

শুক্রবার বিকেলে উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের লাখপুর গ্রামের চর লাখপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশে শীতলক্ষ্যা নদীতে হৃদয়বিদারক এ ঘটনা ঘটে। শনিবার সকাল থেকে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে সৌরভসহ তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন মো. শান্ত (২৪)। তিনি টাঙ্গাইল সদর উপজেলার জুয়েলের ছেলে এবং তিতুমীর সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক (সম্মান) শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি তাহমিদ আইটি ডিজিটালে খণ্ডকালীন চাকরি করতেন।

লাশ উদ্ধার হওয়া অন্য দুজন হলেন- গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার ভঙ্গাল এলাকার সৌদিপ্রবাসী ওবায়দুল্লাহ (৩৮) এবং কাপাসিয়ার ফুলবাড়িয়া গ্রামের ইসমাইলের স্ত্রী শান্তা আক্তার (২৪)। সৌরভ মিয়া শিবপুরের লাখপুর গ্রামের মজনু মিয়ার ছেলে।

পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সৌদিপ্রবাসী ওবায়দুল্লাহ স্ত্রী শাহীনুর আক্তার ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শ্বশুরবাড়ি চর লাখপুরে বেড়াতে এসেছিলেন। গতকাল বিকেল তিনটার দিকে পরিবারের ছয় সদস্য শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল করতে নামেন। গোসলের একপর্যায়ে শান্তা আক্তার নদীতে তলিয়ে যেতে থাকেন। তাকে টেনে ধরতে গিয়ে তার বোন শাহীনুর আক্তারও শিশুসন্তানসহ হাবুডুবু খেতে থাকেন। এ সময় ওবায়দুল্লাহ ও শান্ত তাদের উদ্ধারে এগিয়ে গেলে তারাও পানিতে তলিয়ে যেতে থাকেন।

মুহূর্তেই নদীর পাড়ে তৈরি হয় আতঙ্ক আর চিৎকার-চেঁচামেচি। বিপদে পড়া মানুষগুলোর আর্তনাদ দেখে এক মুহূর্তও না ভেবে তাদের উদ্ধারে নদীতে ঝাঁপ দেন সৌরভ। তীব্র স্রোতের সঙ্গে লড়াই করে শিশুসন্তানসহ শাহীনুরকে পাড়ে তুলে আনেন তিনি। দুজনকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনার পরও থামেননি। আরেকজনকে উদ্ধারের জন্য আবারও নদীতে নামেন সৌরভ। কিন্তু এবার তীব্র স্রোত তাকে টেনে নেয় গভীরে। চোখের পলকেই নিখোঁজ হয়ে যান তিনি।

স্থানীয় লোকজন নদীতে নেমে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করেও কাউকে খুঁজে পাননি।

খবর পেয়ে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে শিবপুর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। তবে নদীতে তীব্র স্রোতের কারণে সন্ধ্যা পর্যন্ত অভিযান চালিয়েও নিখোঁজ চারজনের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

শনিবার সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে ভৈরব থেকে আসা ডুবুরি দলকে সঙ্গে নিয়ে আবার উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। সকাল ১০টার দিকে ওবায়দুল্লাহ ও সৌরভের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে বেলা ১২টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণে সাওরাইদ এলাকায় নদীতে শান্তা আক্তারের লাশ ভাসতে দেখা যায়। পরে তার লাশও উদ্ধার করা হয়।

বেঁচে যাওয়া শাহীনুর আক্তার বলেন, ‘শান্তা তলিয়ে যাচ্ছিল দেখে টেনে ধরে রাখতে চেয়েছিলাম। পরে নিজেও তলিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার স্বামী ও ভাগনে আমাদের বাঁচাতে গিয়ে ডুবে যায়। সৌরভ নামের ছেলেটি ঝাঁপ দিয়ে বাচ্চাসহ আমাকে পাড়ে তোলে। আমাদের বাঁচানোর পর অন্যদের বাঁচাতে আবার নদীতে নামে সে। পরে সেও ডুবে যায়।

শিবপুর ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা আবুল কাশেম বলেন, গতকাল নদীতে তীব্র স্রোত থাকায় ভালোভাবে উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি। আজ ডুবুরি দল নিয়ে আবার অভিযান শুরু করা হয়। এ পর্যন্ত তিনজনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। নিখোঁজ শান্তকে উদ্ধারে আগামীকাল রোববার সকালে আবার অভিযান চালানো হবে।

সৌরভের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অন্যদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে সৌরভ নিজেই প্রাণ হারিয়েছেন। নিজের জীবনের কথা না ভেবে বিপদে পড়া মানুষগুলোর দিকে ছুটে যাওয়া এই তরুণের আত্মত্যাগে এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

শাহীনুরের বাবা সুকচান শেখ ও তার স্ত্রী হাসিনা বেগম বলেন, দাওয়াত খেতে মেয়ে, জামাই ও নাতি বেড়াতে এসেছিলেন। শুক্রবার বাড়ির পাশে নদীতে গোসল করতে গিয়ে তারা ডুবে যান। শাহীনুরের স্বামী ওবায়দুল্লাহ সৌদি আরব থেকে পাঁচ মাসের ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। দুই মাস পর তার আবার সৌদি আরবে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল।

দুলালপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. নাসির উদ্দীন বলেন, ঘটনাটি মর্মান্তিক। বেড়াতে এসে নদীতে গোসল করতে গিয়ে তারা মারা গেছেন।

শিবপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ কোহিনূর মিয়া বলেন, নিখোঁজ চারজনের মধ্যে তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। একজন এখনো নিখোঁজ। তাকে উদ্ধারে আগামীকাল আবার অভিযান চালানো হবে। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

শীতলক্ষ্যার সেই স্রোত কেড়ে নিয়েছে কয়েকটি প্রাণ। তবে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে অন্যদের বাঁচাতে সৌরভের যে সাহসী ছুটে চলা, তা স্থানীয়দের কাছে হয়ে থাকবে এক তরুণের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের বেদনাবিধুর স্মৃতি।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।