বিডা ভবনে দিনব্যাপী ‘ইনভেস্টরস মিটআপ ৩.০’: বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, ব্যবসা সহজীকরণ ও বৈশ্বিক বাজার সম্প্রসারণে গুরুত্বারোপ। ছবি: সমতল মাতৃভূমি
দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, ব্যবসা পরিচালনার প্রশাসনিক জটিলতা ও ব্যয় কমানো, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের হালাল পণ্যের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী নেতা ও খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেছেন, নীতিগত সংস্কার, কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, আন্তর্জাতিক মানের সনদায়ন এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বিনিয়োগের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।
শনিবার (৭ নভেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) ভবনের মাল্টিপারপাস হলে দিনব্যাপী জাতীয় ব্যবসা ও বিনিয়োগ সম্মেলন ‘ইনভেস্টরস মিটআপ ৩.০–২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিডিফেয়ার্স (BDFairs.com) ও জেসিআই ঢাকা অ্যাচিভার্স যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে। নেক্সোরা কনসালটেক লিমিটেড ছিল পাওয়ার্ড বাই পার্টনার। সম্মেলনে সহযোগিতা করে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই), লেদার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ (এলএফবি) এবং জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (জেবিসিসিআই)।
‘বিনিয়োগবান্ধব ইকোসিস্টেম তৈরি: ব্যবসা সহজীকরণ, এফডিআই ও হালাল শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ সম্মেলনে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র, শিল্পায়নের চ্যালেঞ্জ, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, বৈশ্বিক হালাল পণ্যের বাজার এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। দিনব্যাপী আয়োজনে বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়ে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা এবং শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের মতামত ও সুপারিশ তুলে ধরেন।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ)। তিনি বাংলাদেশের শিল্পায়নকে আরও গতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক করতে উৎপাদন ব্যয় কমানো, নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে সম্প্রসারিত হালাল অর্থনীতির বিশাল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আন্তর্জাতিক মানের সনদায়ন ব্যবস্থা, পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন লেদার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের সদস্যসচিব মুফাজ্জল ইবনে মাহফুজ।
সম্মেলনে হালাল শিল্প এবং টেকসই শিল্পায়ন ও ইএসজি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।
সকালের অধিবেশনে ‘হালাল শিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মোমিনুল ইসলাম। প্রবন্ধে তিনি বৈশ্বিক হালাল সরবরাহব্যবস্থা, খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক সনদায়ন, রপ্তানি বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ এবং বাংলাদেশের হালাল শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। এ খাতের সমন্বিত বিকাশ ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ‘হালাল ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি অব বাংলাদেশ’ (HIDAB) গঠনের একটি প্রস্তাবিত কাঠামোও উপস্থাপন করেন তিনি।
অন্যদিকে, বিকেলের অধিবেশনে ‘টেকসই শিল্প ও ইএসজি বিনিয়োগ’ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নেক্সোরা কনসালটেক লিমিটেড, এসএমই ফাউন্ডেশন এবং জাইকা/এপিও (জাপান)-এর পরামর্শক প্রকৌশলী এ. ফাত্তাহ আসিফ। তিনি কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা, গ্রিন ফাইন্যান্সিং এবং আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার মাধ্যমে টেকসই শিল্পায়ন ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের কৌশল ব্যাখ্যা করেন।
সম্মেলনের প্রথম বিশেষায়িত অধিবেশনে ‘হালাল শিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় গুরুত্বপূর্ণ প্যানেল আলোচনা। এতে মডারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ)। আলোচনায় অংশ নেন সম্পাদক, আইন ও বিচার জনাব শফিকুর রহমান; বিএসটিআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক এস. এম. ফেরদৌস আলম; বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) সাবেক সভাপতি সাব্বির এ খান; বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সভাপতি মাহবুব এনাম; ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের হালাল সার্টিফিকেশন বিভাগের প্রধান ড. এ. কে. এম. বদরুল আহসান এবং এনসিসি ব্যাংক পিএলসির এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ইসলামিক ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান আবুল কাশেম মো. সফিউল্লাহ।
আলোচনায় বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের হালাল পণ্যের অবস্থান শক্তিশালী করা, আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সনদায়ন প্রক্রিয়ার মানোন্নয়ন, উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং এ খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। বক্তারা হালাল শিল্পের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে কার্যকর নীতিগত সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
দ্বিতীয় বিশেষায়িত অধিবেশনের বিষয় ছিল ‘টেকসই শিল্প ও ইএসজি বিনিয়োগ’। এতে মডারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নিউ ভিশন সলিউশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও জেবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি তারেক রফি ভূঁইয়া (জুন)। প্যানেল আলোচক হিসেবে অংশ নেন এমইপি কনসালট্যান্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি ওমর ফারুক; সংগঠনটির ফায়ার অ্যান্ড প্লাম্বিং বিভাগের টেকনিক্যাল কো-অর্ডিনেটর আল ইমরান হোসাইন; আমরাক লিমিটেডের চেয়ারম্যান জিসু পার্ক (বিলিয়ন) এবং ডিবিএল সাসটেইনেবিলিটির চিফ সাসটেইনেবিলিটি অফিসার মোহাম্মদ জাহিদুল্লাহ।
এ অধিবেশনে শিল্পকারখানায় জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনিরাপত্তা, টেকসই উৎপাদনব্যবস্থা, কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত (ইএসজি) মানদণ্ড অনুসরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। আলোচকরা টেকসই শিল্পায়নকে শুধু পরিবেশ সুরক্ষার বিষয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে তুলে ধরেন।
সম্মেলনের তৃতীয় অধিবেশনে ‘ব্যবসা সহজীকরণ, এফডিআই ও নতুন বিনিয়োগের সুযোগ’ শীর্ষক শিল্পবিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মডারেটর ছিলেন জেনিস শুজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ফ্ল্যাক্সার সহসভাপতি নাসির খান। প্যানেল আলোচক হিসেবে অংশ নেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) ইনভেস্টমেন্ট সার্ভিস বিভাগের মহাপরিচালক গাজী এ. কে. এম. ফজলুল হক এবং ইতোচু করপোরেশনের চিফ রিপ্রেজেন্টেটিভ ও জেবিসিসিআইয়ের পরিচালক হিরোয়াকি ওউরা।
এ অধিবেশনে বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করা, ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের কার্যকারিতা বাড়ানো, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ও প্রতিবন্ধকতা কমানো, নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের সম্ভাবনা নিয়েও বিস্তারিত মতবিনিময় হয়।
দিনব্যাপী সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে বক্তব্য দেন এ. ফাত্তাহ আল মঞ্জুর আসিফ। তিনি সম্মেলনে উত্থাপিত সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পরে সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিশেষ অতিথি, মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক, অধিবেশন মডারেটর এবং প্যানেল আলোচকদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, ‘ইনভেস্টরস মিটআপ ৩.০–২০২৬’-এ উঠে আসা আলোচনা, অভিজ্ঞতা ও সুপারিশ বাংলাদেশের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা, শিল্প খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, হালাল পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ এবং টেকসই শিল্পায়নের পথ সুগম করতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা জোরদার করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা উন্মোচনেও এ সম্মেলন ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন আয়োজকরা।
